আদিবা মোবাশ্বেরা হক:
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় গড়ে উঠেছে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিবছর স্নাতক সম্পন্ন করছেন ৭ থেকে ৯ লাখ শিক্ষার্থী, কিন্তু চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র ২৫.৪১ শতাংশ মানুষ। একজন সদ্য গ্র্যাজুয়েট প্রতিদিন একবার করে খবরের কাগজে চাকরির বিজ্ঞপ্তি খোঁজেন এবং ক্রমান্বয়ে আবেদন করতে থাকেন। কর্মক্ষেত্রের সীমিত সুযোগের তুলনায় বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী লড়াই করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্যমতে, দেশের মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার, যার মধ্যে প্রায় ৯ লাখ উচ্চশিক্ষিত। শিক্ষিত বেকারত্ব এখন একটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের অনেক মানুষ উপার্জনের জন্য বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিযুক্ত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী আজ রাস্তায় রিকশা চালাচ্ছেন, পাঠাও বা উবারে গাড়ি চালাচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী গ্রাম থেকে শহরে আসেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে, কিন্তু ব্যস্ত জটিল নগরজীবন এবং চাকরির বাজারের অসুস্থ প্রতিযোগিতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তাঁরা পুনরায় গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে শত শত চাকরিপ্রার্থী মোটা মোটা বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের বইগুলো মুখস্থ করে ফেলছেন। জটিল গাণিতিক সমস্যাগুলো প্রতিদিন সমাধান করে যাচ্ছেন। এত পরিশ্রমের বিনিময়েও মিলছে না মনের মতো সরকারি চাকরি। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষায় টিকে যাওয়ার পরও ভাইবা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি করছে। আবার ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রিলি, লিখিত এবং ভাইভাতে টিকে যাওয়ার পরও চূড়ান্ত সুপারিশে বাদ পড়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। চূড়ান্ত সুপারিশে ঠিক কী কারণে শিক্ষার্থীরা বাদ পড়েছেন, তা অনেক সময় অস্পষ্ট থেকে যায়। দিন দিন বিসিএসের প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে তাঁদের স্নাতকের সংখ্যাও। কিন্তু দেশের অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের ব্যবস্থা না থাকা, মাতৃত্বকালীন সময়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানে অবহেলা এবং নিরাপত্তার অভাবের কারণে কর্ম উপযোগী হওয়া সত্ত্বেও অনেক নারী আজও ঘরে বসে আছেন। যার ফলে হাজারো শিক্ষিত নারী হতাশ হয়ে পড়ছেন। বর্তমান সময়ে অনেক নারী ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসায় সময় দিচ্ছেন। কিন্তু সাইবার আক্রমণ, হ্যাকিং এবং অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তিগত জটিলতার জন্য নারীরা এই ডিজিটাল মাধ্যমেও ব্যবসা পরিচালনায় বেশ ভীত হয়ে পড়ছেন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বহুলাংশে মুখস্থবিদ্যা নির্ভর। হাতে গোনা কয়েকটি শিক্ষাক্ষেত্র ছাড়া ব্যবহারিক ক্লাসের সুযোগ নেই। যার ফলে শিক্ষার্থীরা বেশ উচ্চ সিজিপিএ নিয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করলেও তাঁদের সৃজনশীল চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বাস্তবজ্ঞানের প্রয়োগ ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বেশ সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এসব কারণে বেসরকারি কর্মসংস্থান খাতে শত শত শিক্ষার্থী প্রবেশ করতে পারছেন না। অনেক শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা হতে চান, নিজের তৈরি পণ্য দিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য গড়ে তুলতে চান। কিন্তু মূলধন সংগ্রহের জটিলতা, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা, সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব, পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাব এবং নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনায় দুর্বল ভর্তুকি ব্যবস্থার কারণে তাঁরা সামনে এগিয়ে যেতে পারছেন না। ঝুঁকি ও লোকসানের সম্মুখীন হয়ে অনেক উদ্যোক্তা আজ বেকার।
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায়, একজন মাস্টার্স পাস করা তরুণ চাকরি না পেয়ে ডাব বিক্রি করে মায়ের ওষুধের টাকা জোগাড় করছেন। শুরুতে বিষয়টি কোনো নাটকের দৃশ্য মনে হলেও সম্পূর্ণ ঘটনা জানার পর তা এক রূঢ় বাস্তবতা হিসেবে সামনে আসে। এমন ঘটনা আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটছে। শিক্ষিত বেকারত্ব যেমন একটি পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়, তেমনি একটি রাষ্ট্রের জন্যও বেশ চাপের। দেশের মাথাপিছু আয় বাড়লেও সেই তুলনায় বেকারত্বের হার কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে। দেশের অন্যান্য খাতের উন্নয়ন হলেও শিক্ষাখাত এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। যার ফলে আমাদের দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী জনসম্পদে রূপান্তরিত হওয়ার বদলে বোঝায় পরিণত হচ্ছে।
একটি দেশের সামষ্টিক উন্নয়ন নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। তাই আমাদের দেশের শিক্ষাখাতকে আরও আধুনিক করতে ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। সরকার এ বিষয়ে নানামুখী কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল গড়ে তোলা প্রয়োজন। সর্বোপরি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
