মো. শরীফুল ইসলাম:
বাংলাদেশের ট্রেন যাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী একটি পরিবহনব্যবস্থা। শহর থেকে গ্রাম কিংবা দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াতে ট্রেনের ওপর নির্ভরশীলতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিশোরগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি জেলার মানুষের রাজধানীতে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস। কিশোরগঞ্জ রুটে চলাচলকারী তিনটি ট্রেনের মধ্যে এটি অন্যতম হলেও বর্তমানে ট্রেনটি যাত্রীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বহুগুণ বাড়লেও সেই অনুযায়ী রেলসেবার মান বাড়েনি।
পর্যাপ্ত আসন না পেয়ে সাধারণ যাত্রীদের প্রায়ই দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। অনেকে চরম ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ওঠেন। ছাদে উঠতে গিয়ে কিংবা রেললাইনের পাশের গাছের ডালপালার আঘাতে অনেকেই গুরুতর আহত হচ্ছেন। বিশেষত বিমানবন্দর রেলস্টেশনে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যাত্রীছাউনির ওপর দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ট্রেনের ছাদে ওঠার দৃশ্য নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রেনের ছাদে এমন ভ্রমণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে কিশোরগঞ্জের যাত্রীদের চাহিদার তুলনায় কোচের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। চরম আসনসংকট এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে টিকিট কাটার পরও অনেকে নির্ধারিত আসনে বসতে পারেন না।
সময়সূচি বিপর্যয়ের কারণে রাত আটটায় পৌঁছানোর কথা থাকলেও ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছাতে রাত দশটা বেজে যায়। একই পথে চলা অন্য ট্রেনকে ক্রসিং দেওয়ার জন্য নির্ধারিত স্টেশন ছাড়াও যত্রতত্র ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রেনের ভেতরের পরিবেশও অত্যন্ত হতাশাজনক। আসনগুলোতে ময়লা আবর্জনা জমে থাকে এবং শৌচাগারগুলো থাকে অপরিষ্কার। অচল লাইট ফ্যান, ভাঙা জানালা এবং মোবাইল চার্জ করার মতো ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা থেকেও যাত্রীরা প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন।
যাত্রাপথে একের পর এক হকার, অনিয়ন্ত্রিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ও ভিক্ষুকের উৎপাত যাত্রীদের চরম বিরক্ত করে। হকাররা আমড়া, চানাচুর, ঝালমুড়ি, পেয়ারা ও চিপসসহ নানা ধরনের অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি করেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। ১০ থেকে ১২ জন হকার একসঙ্গে ট্রেনে ওঠায় এবং অনেক সময় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকায় যাত্রীদের ওঠানামায় চরম কষ্ট হয়। এর পাশাপাশি যাত্রাপথে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরও অনেকের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছে। প্রতারক ও ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
এই বহুমুখী সংকট সমাধানে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী পুরোনো বগির পরিবর্তে নতুন বগি সংযোজন ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত নির্ধারিত সময়ে ট্রেনের গন্তব্যে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত রেললাইনের পাশের বড় গাছপালা ছেঁটে ফেলতে হবে এবং ট্রেনের ছাদে যেন কোনোভাবেই যাত্রী উঠতে না পারে সেদিকে রেলওয়ে পুলিশকে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাতে হবে। চতুর্থত পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ এবং অচল ফ্যান, লাইট ও জানালা সংস্কার করতে হবে। পঞ্চমত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ও ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
হকার বা ফেরিওয়ালা একেবারে নির্মূল করা সম্ভব না হলেও তাঁদের জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। চলন্ত ট্রেনে হকারি করতে হলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে যাত্রীবাহী বগিতে হকারমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে অনুমোদিত বিক্রেতাদের জন্য আলাদা বগি বা প্রতিটা স্টেশনে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা যেতে পারে।
কিশোরগঞ্জের যাত্রীরা বিলাসবহুল সেবা চান না, বরং একটি নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ ও পরিচ্ছন্ন যাতায়াতব্যবস্থা প্রত্যাশা করেন। মানসম্মত রেলসেবা পাওয়া তাঁদের প্রাপ্য অধিকার। সর্বোপরি যাত্রীসেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি।
