আফিয়া মোবাশসিরা ঐশী:
প্রকৃতি আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য এক বিশাল জগৎ। পাহাড়, নদী, আকাশ, বনভূমি, জীবজন্তু ও বাতাসের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে প্রকৃতির এই বিশাল বিস্তার। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, পরম এবং অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের অন্যতম ভিত্তি। এটি মানুষের তৈরি নয়, স্বয়ংক্রিয় এক শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের উৎস।
বিশুদ্ধ বাতাস থেকে অক্সিজেন, নদী ও জলাধার থেকে প্রয়োজনীয় পানি, মাটি ও কৃষিজমি থেকে খাদ্য প্রকৃতির এসব উপাদানের ওপর নির্ভর করেই আমাদের জীবনধারণ। শুধু তা ই নয়, প্রকৃতি আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে অনন্য ভূমিকা পালন করছে। গাছপালা থেকে পাওয়া বিভিন্ন ঔষধি উপাদানে তৈরি হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। আবার সবুজ প্রকৃতি দেয় মানসিক প্রশান্তি, যার ফলে রক্তচাপ কমে যায় এবং সুস্থ জীবনযাপনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনও মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফসল উৎপাদন, পোশাক ও জীবনযাত্রায়ও বৈচিত্র্য আসে। সূর্যের আলো, বাতাস ও নদীর প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে মানুষ সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যা আধুনিক জীবনযাত্রাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য মানুষের সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তিকেও প্রভাবিত করছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে মানুষ শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও বিজ্ঞান চর্চায় এগিয়ে চলেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতেও প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রকৃতি আমাদের জীবনকে যতটা সমৃদ্ধ, সহজ ও উন্নত করছে মানুষের কর্মকাণ্ড ততটাই তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও ভারসাম্যকে নষ্ট করছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আদর্শ বলে বিবেচিত হয়। অথচ দেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অতিরিক্ত গাছ কাটার ফলে বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মেরু অঞ্চল ও পর্বতশৃঙ্গের বরফ ও হিমবাহ গলতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে দেশে ছয় ঋতুর বদলে তিন ঋতুর (গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত) প্রভাব বেশি লক্ষ করা যায়। সেই সঙ্গে বনভূমি, সবুজের পরিমাণ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে।
অন্যদিকে শিল্পবর্জ্য, নানা ধরনের আবর্জনা ও প্লাস্টিক দূষিত করছে নদী খাল ও জলাশয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে কমছে কৃষিভূমি এবং উন্মুক্ত সবুজ স্থান। যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া বায়ুকে দূষিত করছে। অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার মাটি ও পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করছে, ফলে কমে যাচ্ছে ফসলের উৎপাদন। একই সঙ্গে মাটির উপকারী জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পানি ও খাদ্যশৃঙ্খলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নদীতে সেতু বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। এতে মাছের প্রজননক্ষেত্রসহ জলজ জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
মানুষের কারণে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য ও সৌন্দর্য দুটোই দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতার পাশাপাশি কিছু বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
প্রথমত, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে এবং বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করতে হবে এবং পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয় কমাতে হবে। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি যুবসমাজকে বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মতো জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিতে হবে। তরুণদের পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও টেকসই উন্নয়নের চর্চায় অন্যদেরও উৎসাহিত করতে হবে। চতুর্থত, পলিথিনের ব্যাগের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার পরিহার করে পরিবেশবান্ধব ও জৈব উপকরণ ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে। পঞ্চমত, পাড়া মহল্লা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী দল গড়ে তুলতে হবে। এসব দলের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ, নদী খাল ও পর্যটনকেন্দ্র পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি চালাতে হবে। ষষ্ঠত, উন্নয়ন প্রকল্পে যদি পরিবেশের ক্ষতি হয়, তাহলে যুবসমাজকে সোচ্চার হতে হবে। পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। সপ্তমত, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীসংক্রান্ত আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বা বন্যপ্রাণী শিকারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অষ্টমত, বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের জন্য ওভারপাস বা আন্ডারপাসের ব্যবস্থা করতে হবে। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ যেন ব্যাহত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নবমত, প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশগত শর্তগুলো মানা হচ্ছে কি না, তার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। দশমত, অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া নির্গতকারী যানবাহন ও শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রকৃতিকে রক্ষা করা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়, বরং এটি সবার দায়িত্ব। সাধারণ মানুষের সচেতনতা, যুবসমাজ ও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ একসঙ্গে এগিয়ে গেলেই প্রকৃতির ভারসাম্য ও সৌন্দর্য রক্ষা করা সম্ভব। তরুণদের শক্তি এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতাই পারে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। প্রকৃতির ভারসাম্য ও সৌন্দর্য রক্ষা করেই আমাদের নিজেদের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
