শিরোনাম:
Network News BD
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

পিচঢালা সড়ক যেন অকালমৃত্যুর ফাঁদ

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১:০৫ PM ২৪ বার পঠিত
পিচঢালা সড়ক যেন অকালমৃত্যুর ফাঁদ

ছবি: সংগৃহীত

জান্নাত আক্তার শিলা:

মৃত্যু প্রকৃতিগত ধারাবাহিক নিয়ম হলেও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট এক অনাকাঙ্ক্ষিত আহাজারি। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ ঘটনা নয়, এটি এক ধরনের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। বর্তমানে দেশের সড়কগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। পিচঢালা সড়কে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো মানুষ। একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে গোটা পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। আপনজন হারানোর পাশাপাশি তাঁরা আর্থিকভাবেও চরম অসহায় হয়ে পড়েন। শুধু পরিবার নয়, এর ফলে দেশও হারায় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা একজন দক্ষ জনশক্তিকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অব রোড সেফটি ২০১৮ এর তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ১৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই সড়ক দুর্ঘটনা। সংস্থাটির মতে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। ২০১৮ সালে রাজধানীসহ সারা দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন হয়েছিল। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল এবার হয়তো সড়কের দৃশ্যপট পাল্টাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ৬ হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২৯৪ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১৯ জন আহত হন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫৮৪টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছেন মোটরসাইকেল আরোহীরা। ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭২ জন নিহত হন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং নিহতের ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। নিহতদের মধ্যে ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম ব্যক্তি ছিলেন ৫ হাজার ৭২৩ জন, যা মোট নিহতের প্রায় ৭৮ শতাংশ। সংস্থাটির সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭৩ জন নারী এবং ৬১ জন শিশু রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সড়কে প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে। প্রথমত, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের অভাব। অনেক চালক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া আত্মীয় বা বন্ধুর মাধ্যমে গাড়ি চালানো শেখেন। ফলে ট্রাফিক আইন বা নিরাপদ ড্রাইভিং সম্পর্কে তাঁদের সঠিক ধারণা থাকে না। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রণহীন গতি। গতির উত্তেজনায় চালকেরা বিশেষ করে বাঁক নেওয়ার সময় গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তৃতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহন। পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি রাস্তায় চললে যেকোনো সময় ব্রেক ফেল বা চাকা ফেটে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। চতুর্থত, রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া গর্তযুক্ত ও সংকীর্ণ রাস্তা বৃষ্টির দিনে আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। পঞ্চমত, চালকের ক্লান্তি ও নেশা। দিনের পর দিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর ফলে পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রামের অভাবে চালকেরা নিয়ন্ত্রণ হারান। এ ছাড়া ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, রাস্তার পাশে অবৈধ পার্কিং এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও কিছু কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে তা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সড়কে গতির সীমা নির্ধারণ করে ডিজিটাল ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় জরিমানার ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ফিটনেস সনদ ছাড়া কোনো গাড়ি যেন রাস্তায় চলতে না পারে, তা নিশ্চিতে ডিজিটাল চেকিং সিস্টেম কার্যকর করতে হবে। চতুর্থত, নিয়মিত সড়ক সংস্কার, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় বিকল্প সড়ক নির্মাণ করতে হবে। পঞ্চমত, ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে অবৈধ দখল ও যত্রতত্র পার্কিং বন্ধে সিটি করপোরেশনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া স্কুল কলেজ পর্যায়ে ট্রাফিক আইনের শিক্ষা প্রদান এবং গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো অত্যন্ত জরুরি।

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে চালকের যেমন দায় থাকে, তেমনি রাস্তাঘাট, ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং পথচারীর আচরণও সমভাবে দায়ী। সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই এই মৃত্যুমিছিল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিয়ম মেনে সতর্কতার সঙ্গে পথচলাই পারে সবার নিরাপদে ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে।

শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!