শিরোনাম:
Network News BD
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

পথশিশুদের ভবিষ্যৎ: অনিশ্চয়তা ও মাদকের ভয়াল থাবায় বিপন্ন শৈশব

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৭:৪৮ PM ২৩ বার পঠিত
পথশিশুদের ভবিষ্যৎ: অনিশ্চয়তা ও মাদকের ভয়াল থাবায় বিপন্ন শৈশব

প্রতীকী ছবি © সম্পাদিত

হাবিবা আক্তার সূচি:

একদিকে আলোকিত শহর অন্যদিকে সেই শহরের ফুটপাতেই বেড়ে উঠছে অসংখ্য পথশিশু। বই আর খেলনার বয়সে তাদের হাতে উঠছে নেশা, শ্রম এমনকি অপরাধের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা অর্থাৎ চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল প্রভৃতি এলাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে পথশিশুদের সংখ্যা। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, শিক্ষা ও আশ্রয়ের অভাব এই চারটি কারণই তাদের রাস্তায় ঠেলে দিচ্ছে। পরিবার হারানো কিংবা চরম দারিদ্র্যের শিকার এসব শিশুর অনেকেই রাত কাটায় ফুটপাতে, রেলস্টেশন কিংবা খোলা আকাশের নিচে।

রাস্তায় বসবাসকারী শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয় পথচারীদের দ্বারা। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজনই পথচারীদের দ্বারা নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করে। জীবিকা নির্বাহের জন্য বাধ্য হয়ে বেশির ভাগ শিশু ভিক্ষাবৃত্তি, হকারি, কুলি, রিকশা গ্যারেজে সহকারী, গাড়ি পরিষ্কার, বর্জ্য সংগ্রহ, চায়ের দোকানে কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত থাকে।

পথশিশুদের জীবনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো অনিশ্চয়তা। আজ খাবার জুটলেও আগামীকাল কী হবে, কোথায় রাত কাটাবে কিংবা অসুস্থ হলে কে চিকিৎসা করাবে এসব প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই তাদের কাছে। এই অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেয় ভয়, হতাশা ও মানসিক চাপ। শিশু মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দেয়।

এমনকি এই অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভয়ংকর বাস্তবতা ‘মাদক’। বাংলাদেশের পথশিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত আঠা বা গ্লু, যা স্থানীয়ভাবে ড্যান্ডি নামে পরিচিত। এ ছাড়া গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ঘুমের ওষুধ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যও পথশিশুদের মধ্যে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। বিভিন্ন এলাকায় পথশিশুদের নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পথশিশু নিয়মিত মাদক ব্যবহার করে এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু প্রতিদিন অন্তত একবার নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে। কারণ হিসেবে তারা ক্ষুধা কম অনুভব করা, শীত ভুলে থাকা, দুঃখ কষ্ট ভুলে থাকা এবং বন্ধুদের প্রভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করেছে।

ছিন্নমূল শিশু নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর হিসাবে, দেশের ১২ থেকে ৩৪ লাখ পথশিশুর মধ্যে মাদকের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং অপুষ্টিতে ভোগে প্রায় ৬০ শতাংশ পথশিশু। মাদকাসক্তির ফলে শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যে নানা ধরনের ভয়াবহ ক্ষতি হয় যেমন স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, শেখার ক্ষমতা হ্রাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতা, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের সমস্যা, যকৃৎ ও কিডনির ক্ষতি, হৃদ্‌রোগ এমনকি শারীরিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। মাদকাসক্ত শিশুদের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যাপ্রবণতা, হিংস্র আচরণ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বেশি দেখা যায়।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মাদকাসক্ত পথশিশুরা অপরাধচক্রের সহজ শিকারে পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পথশিশুদের অনেকেরই নেই পারিবারিক জীবন। এই সুযোগে পরিবারহীন শিশুদের দিয়ে অপরাধ কিংবা মাদক ব্যবসা করিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে অনেকেই বড় অঙ্কের টাকা। তাদের দিয়ে চুরি, ছিনতাই, মাদক পরিবহন, চাঁদাবাজি কিংবা অন্যান্য বেআইনি কাজ করানো হয়। অনেক শিশু মানব পাচার ও যৌন শোষণের ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে মাদকাসক্তি শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে না, এটি সমাজে অপরাধ ও সহিংসতার পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের সমন্বিত কমিউনিটি ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ এজেন্সি রাস্তার যেসব শিশু নির্যাতিত ও যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে, তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করছে। পাশাপাশি স্ট্রিট চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল এর সহযোগিতায় ২০১১ সালে এই সংগঠনটি আন্তর্জাতিক শিশু দিবস পালন করে। বিশ্বজুড়ে রাস্তার শিশুদের অধিকার নিয়ে প্রচারের জন্য ২০১১ সালে ইউনিয়ন ফর স্ট্রিট চিলড্রেন বা সিএসসি চালু হয়। এ ছাড়া ঢাকা আহসানিয়া মিশন, চিলড্রেন ফেরদৌস, জাগো ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ স্ট্রিট চিলড্রেন অর্গানাইজেশন প্রভৃতি এনজিও এবং সংস্থা রাস্তার শিশুদের অনুদান ও সীমিত পরিসরে সহায়তা প্রদান করে। পথশিশু কল্যাণ ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন সংগঠন ইতিমধ্যে শিক্ষা ও পুনর্বাসনের কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে এই উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। এসব পথশিশুদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করতে পারেনি রাষ্ট্র। যদিও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজধানীতে পথশিশুদের পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে দুটি, যার একটি কমলাপুরে এবং অপরটি কারওয়ান বাজারে।

সরকারি ও বেসরকারি এত উদ্যোগের পরও প্রশ্ন থেকেই যায়, কমছে কি পথশিশুদের সংখ্যা? আর যে হাতে বই থাকার কথা, সেই হাতেই যদি উঠে আসে নেশা কিংবা অপরাধের অস্ত্র তবে সে দায় আসলে কার? এই দায় কি পরিবার, সমাজ নাকি রাষ্ট্রের?

 শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ এবং সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!