বাঙালি সমাজে বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে যুগে যুগে নানা মিথ ও নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন, শাশুড়ি ও পুত্রবধূর মধ্যে মধুর সম্পর্ক হওয়া বুঝি একেবারেই অসম্ভব! কিন্তু বাস্তব জীবনে এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলা খুব জরুরি। কারণ, শাশুড়ির সঙ্গে আপনার সুসম্পর্ক কেবল আপনাদের দুজনের জন্যই নয়, বরং আপনার দাম্পত্য জীবনকে আরও সুখময় করতে বড় ভূমিকা রাখে। নিজের মায়ের মতো শাশুড়িকেও যখন আপনি ভালোবাসতে শুরু করবেন, তখন আপনার স্বামীর চোখেও আপনার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা বহুগুণ বেড়ে যাবে। সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সহজ ও মানবিক উপায় অনুসরণ করলে শাশুড়ির সঙ্গে একটি চমৎকার ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
শাশুড়িকে নিজের মায়ের আসনে বসান
সম্পর্ক সুন্দর করার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো মানসিকতার পরিবর্তন। শাশুড়িকে কেবল ‘স্বামীর মা’ হিসেবে না দেখে নিজের মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, তিনি দীর্ঘকাল ধরে এই সংসারটি পরম যত্নে আগলে রেখেছেন। তাঁর এই অবদানকে স্বীকৃতি দিন এবং তাঁর কাছ থেকে ভালো দিকগুলো শেখার চেষ্টা করুন। দেখবেন, সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে।
অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার কদর করুন
বয়স ও অভিজ্ঞতায় তিনি আপনার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। তাই সংসারের নানা বিষয় কিংবা সন্তান লালনপালনের ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ চাইলে তিনি খুশি হবেন। হয়তো সব সময় তাঁর মতামত আপনার আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে মিলবে না, তবুও তাৎক্ষণিকভাবে তা বাতিল বা অবজ্ঞা করবেন না। বরং ধৈর্য ধরে তাঁর কথাগুলো শুনুন। তাঁর জীবনের সঞ্চিত প্রজ্ঞা আপনাকে নতুন কোনো সমাধানের পথও দেখাতে পারে।
তাঁর শখ ও পছন্দের প্রতি আগ্রহ দেখান
শাশুড়িকে খুশি রাখার জন্য খুব বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই, ছোট ছোট বিষয়গুলোই যথেষ্ট। তাঁর ভালো লাগা ও শখের কাজগুলোর প্রতি আন্তরিক আগ্রহ দেখান। তিনি যদি বই পড়তে ভালোবাসেন, তবে তাকে ভালো বই উপহার দিতে পারেন। কিংবা তিনি যদি বাগান করতে পছন্দ করেন, তবে বারান্দা বা ছাদে তাঁর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটান। একসঙ্গে এমন ছোটখাটো কাজগুলো আপনাদের মধ্যে দারুণ এক আত্মিক বন্ধন তৈরি করবে।
মা-ছেলের নিজস্ব সম্পর্কের জায়গাটি মেনে নিন
প্রতিটি ছেলের সঙ্গেই তাঁর মায়ের একটি গভীর ও বিশেষ সম্পর্ক থাকে। এই চিরন্তন সত্যটিকে সহজভাবে মেনে নিন। কোনোভাবেই এই সম্পর্ক নিয়ে ঈর্ষান্বিত হবেন না বা স্বামী-শাশুড়ির মাঝে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করবেন না। এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন না যেখানে আপনার স্বামীকে মা ও স্ত্রীর মধ্যে কাউকে একজনকে বেছে নেওয়ার মতো কঠিন মানসিক দ্বন্দ্বের মুখে পড়তে হয়।
তর্কে জড়ানো থেকে বিরত থাকুন
যেকোনো সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অযথা তর্ক-বিতর্ক। তর্কে হয়তো সাময়িকভাবে জেতা যায়, কিন্তু সম্পর্কের সুতোয় যে টান পড়ে, তার রেশ থেকে যায় আজীবন। তাই শাশুড়ির সঙ্গে মতবিরোধ হলে তর্কে না জড়িয়ে শান্ত থাকুন। আগে তাঁর দিকটি বোঝার চেষ্টা করুন, এরপর নরম ও বিনয়ী স্বরে নিজের মতামত তুলে ধরুন।
অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করবেন না
প্রতিটি মানুষই নিজের মতো করে অনন্য। তাই নিজের মায়ের সঙ্গে বা অন্য কারও শাশুড়ির সঙ্গে নিজের শাশুড়ির তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন। তুলনা করলেই মনে একধরনের অপ্রাপ্তি ও হতাশা তৈরি হয়, যা সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। তিনি যেমন, তাঁকে সেভাবেই হাসিমুখে গ্রহণ করার চেষ্টা করুন।
ত্রুটির বদলে ইতিবাচক দিক খুঁজুন
পৃথিবীতে কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আপনার শাশুড়িরও হয়তো কিছু ত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলোকে বড় করে না দেখে, তাঁর স্বভাবের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি মনোযোগ দিন। একটু খুঁজলেই হয়তো দেখতে পাবেন তাঁর ভেতরে এমন অনেক গুণ রয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
শাশুড়ির সঙ্গে একটি সুন্দর ও আস্থার সম্পর্ক রাতারাতি গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক চেষ্টা, সময় ও আন্তরিকতা। তবে আপনার এই ছোট্ট প্রয়াস আপনার দাম্পত্য জীবনে যে জাদুকরী পরিবর্তন আনবে, তা আপনাকে এক অনাবিল শান্তির অনুভূতি দেবে। শাশুড়ির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক শুধু একটি শান্তিময় সংসারই উপহার দেয় না, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বোঝাপড়াকেও করে তোলে আরও মজবুত।
শুভ্র/
