শিরোনাম:
Network News BD
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

হৃৎপিণ্ড নাকি মস্তিষ্ক: আবেগ ও অনুভূতির নাটাই কার হাতে?

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৫৪ AM ৩৪ বার পঠিত
হৃৎপিণ্ড নাকি মস্তিষ্ক: আবেগ ও অনুভূতির নাটাই কার হাতে?

প্রতীকী ছবি © সম্পাদিত

মুজাহিদুল ইসলাম:

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে অবস্থানের কারণে আমাদের প্রতিনিয়ত নানা পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির কারণে আমরা সব সময়ই কিছু না কিছু আবেগি অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাই। রাগ, হাসি আনন্দ, দুঃখ কষ্ট বা অতি উচ্ছ্বাস এসব আবেগের মধ্যে অন্যতম। কিছু আবেগ ধীরে ধীরে পরিবর্তনশীল। যেমন কোনো আপনজন গত এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকলে সেখানে দুঃখের আবেগ কাজ করলেও তা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় বহমান থাকে। আপনজনের সার্বিক শারীরিক পরিস্থিতির ওঠানামার ওপর এই দুঃখের মাত্রা নির্ভর করে। আবার প্রিয়জনের সঙ্গে প্রতিদিন কাটানোর সময় যে সুখের আবেগ কাজ করে, সেটিও একটি মাত্রার ভেতর ওঠানামা করে।

তবে সব আবেগ ধীরে ধীরে আসে না। কিছু আবেগ অল্প সময়ের ব্যবধানে আকস্মিকভাবে আসে। যেমন হঠাৎ প্রিয়জনের মৃত্যুর খবর বা বড় অনুষ্ঠানে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশংসা করার মতো ঘটনা। আমরা যখন এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, তখন আমাদের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। বুকের ভেতর এই তীব্র ব্যথা অনুভবের কারণে যুগে যুগে কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা মন শব্দটির ব্যবহারের সময় বারবার বুকের বা হৃৎপিণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আমাদের ভাষায় এমন অনেক পরিচিত শব্দ আছে, যেমন মন ভেঙে যাওয়া, মনে আশ্রয় দেওয়া, গর্বে বুক ভরে যাওয়া বা কষ্টে বুক ফেটে যাওয়া। এ কারণে আমরা ধীরে ধীরে কাউকে মস্তিষ্কে বা স্মৃতিতে স্থান না দিয়ে বুকে, প্রাণে কিংবা হৃৎপিণ্ডে আশ্রয় দেওয়া শুরু করেছি। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, বেচারা হৃৎপিণ্ড আসলে একটি পাম্পিং মেশিনের বাইরে আর কিছুই নয়। তার জীবদ্দশায় পুরোপুরি থেমে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিশ্রাম নেই। সে এত আবেগ, অনুভূতি কিংবা কাউকে আশ্রয় বা স্থান দেওয়ার মতো জটিল ব্যাপারগুলোর কিছুই বোঝে না।

আমরা জানি, আমাদের স্মৃতি, আবেগ, অনুভূতি ও সিদ্ধান্তের সবই মস্তিষ্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা কিংবা মোচড় দিয়ে ওঠা এসব মস্তিষ্কে অনুভূত হওয়ার কথা ছিল, যদিও মস্তিষ্কে কোনো পেইন রিসেপ্টর নেই। প্রশ্ন হলো, কষ্ট এবং আনন্দের মতো সম্পূর্ণ বিপরীত অনুভূতির জন্যই বুকের ভেতর একই ব্যথা অনুভব হয়, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয় ও হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় কেন? নাকি এসব প্রশ্ন শুধু আমাদের মাথাতেই আসে? এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, দুঃখ বা আনন্দের অনুভূতির ক্ষেত্রে একই ধরনের চাপ, ব্যথা কিংবা চোখ দিয়ে পানি আসার মতো ব্যাপার ঘটার পেছনে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।

ধরুন, হঠাৎ অফিসের বস কিছু না জানিয়ে জরুরি দরকারে আপনাকে ডাকলেন। আপনি ঘামতে শুরু করলেন। এই অবস্থায় আপনার যে উত্তেজিত অনুভূতি হবে, সেটি মূলত উদ্বিগ্নতা। সেখানে গিয়ে সাক্ষাতের পর তিনি যদি আপনার প্রশংসা করেন এবং বেতন বাড়ানোর খবর দেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আপনার আগের অনুভূতিটি তার জায়গায় থেকেই খুশির উত্তেজনায় রূপ নেবে, অথবা আপনি সেই অনুভূতিটি খুশির জন্য হচ্ছে বলে মনে করবেন। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন আবেগের দুই কারণ তত্ত্ব বা শ্যাচটার সিঙ্গার থিওরি (Schachter Singer theory)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী শারীরিক উত্তেজনা এবং পরিস্থিতির ব্যাখ্যার সম্মিলিত রূপই হলো আবেগের নাম।

এটি নিয়ে ১৯৭৪ সালে মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ডাটন এবং আর্থার অ্যারন কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ক্যাপিটাল নদীর ওপর একটি দারুণ মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন, যা ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজ এক্সপেরিমেন্ট (Capilano Suspension Bridge Experiment) নামে পরিচিত। নদী থেকে ২৩০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত ৪৫০ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত ও সরু ব্রিজটি বাতাসে দুলতে থাকে। উচ্চতার কারণে সেখান দিয়ে পার হওয়ার সময় যে কারও ভয় লাগত এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে যেত। গবেষকেরা ঝুলন্ত সেতুর ওপর একজন সুন্দরী নারীকে রাখেন। তিনি ব্রিজ পারাপারের সময় পুরুষদের কিছু প্রশ্ন করতেন, পূরণের জন্য একটি ফর্ম দিতেন এবং একটি মেয়ের মুখ ঢাকা ছবি দেখিয়ে কাল্পনিক গল্প লিখতে বলতেন। শেষে তিনি পরীক্ষাটি নিয়ে আরও আলোচনা করতে চাইলে তাঁকে ফোন করার কথা বলে সবাইকে নিজের ফোন নম্বর লিখে দেন। একই পরীক্ষাটি মাটি থেকে মাত্র কয়েক ফুট উঁচুতে তৈরি একটি শক্ত ও স্থির কাঠের ব্রিজেও করা হয়েছিল, যেখানে ভয় লাগার মতো কোনো বিষয় ছিল না।

পরীক্ষা শেষে গবেষকেরা দেখতে পান, উঁচু এবং দুলতে থাকা ব্রিজের প্রায় ৫০ শতাংশ পুরুষ পরে ওই তরুণীকে ফোন করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁরা সেই ছবির মেয়েটিকে নিয়ে যে কাল্পনিক গল্পগুলো লিখেছিলেন, সেগুলোতেও রোমান্টিকতা বা আকর্ষণের প্রকাশ প্রায় দ্বিগুণ ছিল। অন্যদিকে নিরাপদ ব্রিজের মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ পুরুষ তরুণীটিকে ফোন করেছিলেন এবং তাঁদের লেখায় রোমান্টিক কথা অনেক কম ছিল। মনোবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে শারীরিক উত্তেজনার ভুল উৎস নির্ধারণ বা মিসঅ্যাট্রিবিউশন অব অ্যারাজাল (Misattribution of Arousal) বলা হয়। যখন পুরুষেরা বিপজ্জনক ঝুলন্ত ব্রিজ দিয়ে হাঁটছিলেন, তখন পড়ে যাওয়ার ভয়ের কারণে তাঁদের শরীরে অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হচ্ছিল, বুক ধুকপুক করছিল এবং কাঁপছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই সামনে একজন সুন্দর তরুণীকে দেখে তাঁদের অবচেতন মস্তিষ্ক শারীরিক অনুভূতির উৎস গুলিয়ে ফেলে। অর্থাৎ বিপজ্জনক ব্রিজের উচ্চতা ও ভয়ের কারণে শরীরে যে দ্রুত হৃৎস্পন্দন ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, মস্তিষ্ক তাকে ভুল করে তরুণীটির প্রতি আকর্ষণের অনুভূতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে নিয়েছিল। তাই চাইলে অনুভূতির ব্যাখ্যা বদলে শরীরের প্রতিক্রিয়াও কিছুটা বদলানো যায়। যেমন পরীক্ষার আগে বুক ধড়ফড় করলে নিজেকে আমি নার্ভাস না বলে শরীর প্রস্তুত হচ্ছে বা উত্তেজিত বলা যায়। গবেষণায় এতে পারফরম্যান্স ভালো হতে দেখা গেছে।

বুকের ভেতর মোচড় দেওয়ার অনুভূতির পেছনে স্নায়বিক সমাপতন বা নিউরোলজিক্যাল ওভারল্যাপ (Neurological Overlap) কাজ করে। মানসিক ব্যথা যেমন দুঃখ, প্রত্যাখ্যান বা শোক এবং শারীরিক ব্যথা মস্তিষ্কের একই অংশে প্রক্রিয়াজাত হয়। বিশেষ করে মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স (Anterior Cingulate Cortex) এবং ইনসুলা (Insula) নামক অংশ দুটি শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের ব্যথার ক্ষেত্রেই সক্রিয় হয়। এ কারণেই আমরা মানসিক কষ্টের সময়ও বুকে ব্যথা অনুভব করি।

এর পাশাপাশি রয়েছে স্ট্রেস হরমোনের প্রভাব। কষ্ট বা দুঃখের সময় শরীর এটিকে একটি সংকট বা হুমকি হিসেবে গণ্য করে, ফলে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোনের আকস্মিক বৃদ্ধি ঘটে। এই হরমোনের প্রভাবে হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়, রক্তনালি সংকুচিত হয় এবং বুকের পেশিগুলো টানটান হয়ে যায়, যা বুকে চাপ বা ব্যথার অনুভূতি তৈরি করে। এ ছাড়া তীব্র আবেগ বা দুঃখের সময় মস্তিষ্ক থেকে হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্র পর্যন্ত বিস্তৃত ভেগাস নার্ভ (Vagus Nerve) অতিরিক্ত উদ্দীপ্ত হয়ে যেতে পারে। এতে বুকে বা পেটে একধরনের মোচড়, খালি বা ভারী অনুভূতি তৈরি হয়, যাকে সাধারণ ভাষায় বুক চেপে আসা বা বুক ধড়ফড় করা বলা হয়। তবে সব ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক ঘটনা নাও হতে পারে। যদি বুকে ব্যথা অসহনীয় হয়, বাঁ হাতে বা চোয়ালে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে, তীব্র শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত ঘাম হয়, তবে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এগুলো প্রকৃত হৃদ্‌রোগের লক্ষণও হতে পারে।

শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ।

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!