বাংলা সাহিত্যের কালপঞ্জিতে ‘মধ্যযুগ’ এক দীর্ঘ ও রূপান্তরকামী অধ্যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ—এই প্রায় ছয়শত বছরের কালসীমাকে সাধারণত বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রাজনৈতিক পালাবদল, ধর্মীয় মিথস্ক্রিয়া এবং সামাজিক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে এই যুগের সাহিত্য বিকশিত হয়েছে। প্রাচীন চর্যাপদের রহস্যময় ও সাধনসংকেতপূর্ণ আবহ থেকে বেরিয়ে মধ্যযুগের সাহিত্য এক নতুন জনপরিসর তৈরি করে, যেখানে লৌকিক ও অলৌকিক চেতনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য মূলত ধর্মীয় উপাখ্যান গুলোর কাব্যিক সংস্করণ এবং লৌকিক প্রেমগাঁথা। মধ্যযুগের সাহিত্য গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, রামায়ণ ও মহাভারতের বঙ্গানুবাদ, মঙ্গলকাব্য, মানসিংহ গীতিকা ও নাথ সাহিত্য, পদ্মাবতী, মৈমনসিংহ-গীতিকা, বৈষ্ণবপদাবলী, চৈতন্যজীবনী কাব্য, ইউসুফ জুলেখা, লাইলি মজনু সহ আরো রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ইত্যাদি।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম বিরহ নিয়ে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
চর্যাপদ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে রূপান্তরের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। আনুমানিক ১৩৫০ থেকে ১৪৫০ সালে বড়ু চণ্ডীদাস রচিত এই গ্রন্থ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রথম সর্বজন স্বীকৃত সাহিত্যকর্ম। বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ ১৯০৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের কাছে কাকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের গোয়াল ঘর থেকে এর পান্ডুলিপি উদ্ধার করেন। উদ্ধার করার সময় এই প্রতিটি প্রথম এবং শেষের পৃষ্ঠা ছেঁড়া ছিল। এইজন্য তার নামকরণ নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হয়। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে বসন্ত রঞ্জন রায় এটি সম্পাদনার সময় পুঁথিতে প্রাপ্ত শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ নাম হতে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামকরণ করেন। তৎকালীন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। মোট তেরোখন্ডে বিভক্ত এই গ্রন্থের প্রধান চরিত্র শ্রীকৃষ্ণ, রাধা এবং বার্তাবাহক বড়াই। এই গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণকে কোনো পরমেশ্বর রূপে নয়, বরং সাধারণ একজন প্রেমিক এবং চতুর বালক হিসেবে উপস্থাপনা করা হয়। গ্রন্থটিতে ব্রজবুলি ঘেঁষা বাংলা ভাষার রূপান্তরিত অপভ্রংশ ও প্রাকৃতের প্রভাব যুক্ত ভাষারীতির ব্যবহার করা হয়। শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রণয় এবং শেষে তাদের বিরহ নিয়ে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচিত।
রামায়ণ ও মহাভারতের বঙ্গানুবাদ
মূল রামায়ণ ও মহাভারত রচনার আনুমানিক সময়কাল যথাক্রমে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে পঞ্চম শতাব্দী এবং খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী। পরবর্তীতে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কৃত্তিবাস ওঝা রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করেন। অন্যদিকে, বাংলা ভাষায় মহাভারতের প্রথম অনুবাদক কবীন্দ্র পরমেশ্বর হলেও, সপ্তদশ শতাব্দীতে কাশীরাম দাসের করা বঙ্গানুবাদই সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মোট সাতটি কাণ্ডে বিভক্ত ও চব্বিশ হাজার শ্লোক সম্বলিত রামায়ণ পিতৃ সত্য পালন পারিবারিক আদর্শ ও পরমার্থিক নৈতিকতা বিষয়ক হিন্দু ধর্মীয় একটি আদি ধর্মগ্রন্থ। রামায়ণের মূল চরিত্রগুলি সম্পূর্ণরূপে আদর্শিক অথবা খল হলেও মহাভারতের চরিত্রগুলো মিশ্র বা ধূসর ( Grey)। রামায়ণ ত্রেতা যুগের এবং মহাভারত দ্বাপর যুগের কাহিনী সংবলিত। মহাভারত একটি বিশাল গ্রন্থ। এতে আঠারোটি খণ্ড এবং ১ লাখ শ্লোক আছে। জটিল রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ধর্মের জয় ও অধর্মের পরাজয় মহাভারতের মূলভাব। শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবগণ এবং কৌরবগণ ও উনাদের পরিবারবর্গ- আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে মহাভারতের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। ইলিয়াড ও ওডিসির সম্মিলিত রূপের চেয়েও ১০ গুন বড় মহাভারত। এজন্যই বলা হয়ে থাকে যে, যা নেই ভারতে (মহাভারতে), তা নেই ভারতে (ভারতবর্ষে)।
পাঁচশ বছর সময়ব্যাপী রচিত মঙ্গলকাব্য
৫০০ বছর সময় ধরে রচিত কোনো সাহিত্যকর্ম বা গ্রন্থ যেকোনো ভাষার সাহিত্য ইতিহাসে বিরল। মঙ্গলকাব্য ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত রচিত একটি বিশাল গ্রন্থ। যা বাংলা সাহিত্যের এক সোনালী অতীত। লৌকিক অনার্য দেবদেবীদের মাহাত্ম্য প্রচার তাঁদের পূজাপ্রতিষ্ঠা মঙ্গলকাব্য রচনার প্রধান উদ্দেশ্য। মোট ১৫০ জন কবি (মতান্তরে আরও বেশি) এই কাব্যের রচয়িতা। মূলত পয়ার ছন্দে আধুনিক পাঁচালী সুরে পাঠযোগ্য এই রচনা তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত। মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল এবং অন্নদামঙ্গল। সর্প দেবী মনসার পূজা প্রতিষ্ঠা এবং মাহাত্ম্য বর্ণনা মনসামঙ্গলের উপজীব্য। শিবভক্ত চাঁদ সওদাগরের দর্প চূর্ণ ও বেহুলা লক্ষিন্দর এই কাব্যের প্রধান উপাখ্যান। মঙ্গলকাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি বিজয় গুপ্ত আদি কবি হরিদত্ত। মঙ্গলকাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ধারা হল চণ্ডীমঙ্গল। দেবী চণ্ডীর পূজা-প্রচার ও মাহাত্ম্য বর্ণনা এই কাব্যের অংশ। ব্যাধ কালকেতু ও ফুল্লরার গল্প, বণিক ধনপতি ও শ্রীমন্তের গল্প এই কাব্যের উল্লেখযোগ্য উপাখ্যান। চন্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। যাঁকে ব্রাহ্মণভূমির জমিদার রঘুনাথ রায় কবিকঙ্কন উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য বর্ণনা এবং পূজাপ্রতিষ্ঠা অন্নদামঙ্গলের প্রধান উপজীব্য। লৌকিক প্রেমের কাহিনী বিদ্যাসুন্দর ও রাজা মানসিংহের কাহিনী এই কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। বহুল প্রচলিত, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে, পঙক্তিটি অন্নদামঙ্গলের অংশ। অন্নদামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর। যাকে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবিও বলা হয়।
শুভ্র/
