গাছ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ঘরের আয়তন ও আসবাবের বিন্যাসের দিকে নজর দেওয়া দরকার। বসার ঘরের ফাঁকা কোণে মনস্টেরা, ফিডল লিফ ফিগ কিংবা স্নেক প্ল্যান্ট রাখা যেতে পারে। বড় পাতার গাছ ঘরের সাজে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যোগ করে। তবে গাছের আকার এমন হওয়া উচিত, যাতে ঘরে চলাচলে বাধা না পড়ে।
তুলনামূলক কম আলো পাওয়া জায়গায় মানিপ্ল্যান্ট, জিজি প্ল্যান্ট বা পিস লিলির মতো গাছ বিবেচনা করা যায়। তবে কোনো গাছই আলো ছাড়াই ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। ঘরের যে অংশে গাছ রাখা হবে, সেখানে প্রজাতি অনুযায়ী পর্যাপ্ত আলো পৌঁছায় কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। শোবার ঘরে বিছানার পাশে লম্বা পামগাছ রাখা যেতে পারে। বারান্দায় সিঙ্গোনিয়াম, ফুলের গাছ, ক্যাকটাস কিংবা অর্কিড দিয়ে তৈরি করা যায় ছোট্ট সবুজের জগৎ। জায়গা থাকলে রেলিং থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া যায় লতানো ফুলের গাছও।
গাছ রাখার পাত্র ও স্ট্যান্ডের নির্বাচনেও থাকতে পারে নান্দনিকতা। মাটির টব, বাঁশের তৈরি স্ট্যান্ড কিংবা কাঠের গাছ রাখার তাক ঘরের সামগ্রিক সাজের সঙ্গে মানিয়ে যায়। একসঙ্গে অনেক গাছ রাখার বদলে কয়েকটি গাছকে পরিকল্পিতভাবে সাজালে ঘর দেখাবে পরিপাটি।
কাঠ, বাঁশ, বেতেই আসুক স্বাভাবিক সৌন্দর্য
প্রকৃতির ছোঁয়ায় ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে গাছের পাশাপাশি উপকরণের নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। কাঠ, বাঁশ, বেত, পাট, মাটি ও পাথরের মতো উপাদান ঘরের সাজে স্বাভাবিক সৌন্দর্য এনে দিতে পারে। প্রতিদিনের ব্যবহারের জিনিসেও এসব উপকরণ যুক্ত করা সম্ভব। যেমন, প্লাস্টিকের ঝুড়ির বদলে বেত বা বাঁশের ঝুড়ি, কাচের পাত্রের পরিবর্তে মাটির পাত্র কিংবা দেয়াল সাজাতে কাঠ ও পাটের তৈরি নকশাদার সামগ্রী ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশের ঘরবাড়িতে বাঁশ, বেত ও পাটের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। বরং পরিচিত এই উপকরণগুলোকে একটু ভিন্নভাবে সাজিয়ে ব্যবহার করলেই অন্দরসজ্জায় আসতে পারে আধুনিকতার ছোঁয়া। কাঠের ছোট তাক, বেতের চেয়ার কিংবা মাটির ফুলদানি ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি সাজে দেশীয় বৈশিষ্ট্যও যোগ করবে।
খোলা বারান্দা কিংবা ছাদ থাকলে সেখানে তৈরি করা যায় ছোট্ট বসার জায়গা। মেঝেতে কৃত্রিম ঘাস বিছিয়ে তার ওপর দুটি বেতের চেয়ার ও একটি ছোট টেবিল রাখলেই তৈরি হবে মনোরম পরিবেশ। সকালে এক কাপ চা কিংবা বিকেলের অবসরে বই পড়ার জন্য জায়গাটি হয়ে উঠতে পারে প্রিয় আশ্রয়। তবে বারান্দায় গাছ ও আসবাব রাখার সময় পানি নিষ্কাশন, পরিচ্ছন্নতা এবং চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করতে হবে।
পর্দা থেকে খাবার টেবিল, বদল আসুক ছোটখাটো সাজেও
বায়োফিলিক অন্দরসজ্জায় ঘরের প্রতিটি উপাদানের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। শোবার ঘরে দিনের আলো ও বাতাস চলাচলের সুযোগ রাখতে হবে। জানালায় ভারী পর্দার বদলে হালকা সুতির বা লিনেনের পর্দা ব্যবহার করলে ঘরে কোমল আবহ তৈরি হতে পারে। ঘিয়ে রঙের পর্দা, কাঠের আসবাব এবং সবুজ গাছের সমন্বয় ঘরকে দিতে পারে স্নিগ্ধ চেহারা।
কাচ বা প্লাস্টিকের তৈরি বাতিদানের পরিবর্তে কাঠ কিংবা বেতের বাতিদান বেছে নেওয়া যায়। খাবার টেবিলের মাঝখানে ছোট একটি মানিপ্ল্যান্ট রাখা যেতে পারে মাটির টবে বা উপযুক্ত কাচের পাত্রে। চাইলে মাটি ছাড়া পানিতে গাছ বেড়ে ওঠার উপযোগী পদ্ধতিও ব্যবহার করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে গাছের প্রজাতি ও পরিচর্যার নিয়ম জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
দেয়াল, আসবাব ও পর্দার রঙেও প্রকৃতির অনুষঙ্গ রাখা যেতে পারে। সবুজ, বাদামি, ঘিয়ে কিংবা মাটির কাছাকাছি রং ঘরের সাজে সামঞ্জস্য তৈরি করে। তবে সবকিছু একই রঙে সাজানোর প্রয়োজন নেই। বরং রঙের বৈচিত্র্য ও উপকরণের সঠিক সমন্বয়ই ঘরকে প্রাণবন্ত করে তুলবে।

নরম আলোয় তৈরি হোক প্রশান্তির আবহ
ঘরের সাজে আলোর ভূমিকা অনেক বড়। খুব তীব্র আলোয় পুরো ঘর আলোকিত না করে প্রয়োজন অনুযায়ী নরম আলো ব্যবহার করা যেতে পারে। বসার ঘরের এক কোণে মেঝেতে রাখার বাতি, ছোট আলোকমালা কিংবা সুগন্ধি মোমবাতি ঘরে শান্ত আবহ তৈরি করতে পারে। তবে মোমবাতি ব্যবহারের সময় অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।
বেত ও বাঁশের সূক্ষ্ম বুননে তৈরি বাতিদান ঝুলন্ত আলো কিংবা খাবার টেবিলের ওপর ব্যবহার করা যায়। এসব বাতিদানের ফাঁক দিয়ে আলো বেরিয়ে দেয়ালে ছায়ার নকশা তৈরি করলে ঘরের সাজে যোগ হবে ভিন্নমাত্রা। একইভাবে ঘরের কোণে রাখা বড় পাতার গাছের ওপর উষ্ণ আভাযুক্ত আলো ফেললে রাতে গাছের আকৃতি ও পাতার সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
তবে আলো শুধু সাজের জন্য নয়, ব্যবহারিক প্রয়োজনেও উপযোগী হওয়া দরকার। পড়ার জায়গা, রান্নাঘর কিংবা কাজের টেবিলে পর্যাপ্ত আলো থাকতে হবে। অন্যদিকে বিশ্রামের জায়গায় কোমল আলো ব্যবহার করলে পরিবেশ আরামদায়ক হতে পারে।
দামি সাজ নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত পরিবর্তন
প্রকৃতির ছোঁয়ায় ঘর সাজানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর জন্য একসঙ্গে অনেক অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজন নেই। ঘরে আগে থেকেই থাকা আসবাব ও উপকরণ নতুনভাবে সাজানো, জানালার সামনে জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলা কিংবা অব্যবহৃত কোণে একটি গাছ রাখা দিয়েই শুরু করা যায়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে যুক্ত করা যেতে পারে প্রাকৃতিক উপকরণ ও মানানসই আলোর ব্যবস্থা।
তবে মনে রাখা দরকার, গাছ রাখলেই ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ হয়ে যাবে কিংবা সব ধরনের মানসিক ক্লান্তি দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। গাছের পরিচর্যা, ঘরের পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং আরামদায়ক পরিবেশের সমন্বয়ই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
দিনের বড় একটি সময় যখন ঘরের ভেতরে কাটে, তখন সেই পরিবেশকে স্বস্তিদায়ক করে তোলার গুরুত্বও বাড়ে। বায়োফিলিক অন্দরসজ্জা সেই সুযোগ তৈরি করে প্রকৃতিকে দৈনন্দিন জীবনের কাছাকাছি এনে। তাই ঘর সাজানোর পরবর্তী পরিকল্পনায় শুধু নতুন আসবাব বা বাহারি উপকরণের কথা না ভেবে একটু সবুজ, প্রাকৃতিক উপাদান আর আলো-বাতাসের জন্যও জায়গা রাখা যেতে পারে। কারণ সুন্দর ঘর মানে শুধু চোখে ভালো লাগা নয়, সেই ঘরে স্বচ্ছন্দে থাকা এবং নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগও।
