মো. মাহাবুব আলম সরকার:
আমরা কি সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছি নাকি সমস্যা মেনে নিতে শিখেছি। প্রতিদিন ঘর থেকে বেরিয়ে সড়কে পা রাখতেই যখন নাকে রুমাল বা হাত চাপা দেওয়া আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয় তখন নিজেদেরই একটি মৌলিক প্রশ্ন করা জরুরি হয়ে পড়ে আমরা কি আসলেই নাগরিক সংকটগুলো মেনে নিয়েছি বা স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি। মানিয়ে নেওয়া বা অভিযোজন হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সাময়িক কৌশল যার পেছনে পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার তাগিদ থাকে। অন্যদিকে মেনে নেওয়া হলো একধরনের আত্মসমর্পণ যেখানে অব্যবস্থাপনা নাগরিক অসচেতনতা ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। আমাদের চারপাশে যত্রতত্র ময়লা ফেলা এবং দিন দিন প্রকট হয়ে ওঠা নোংরা পরিবেশ দেখলে মনে হয় এই অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতাকে আমরা স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছি।
একটি শহরের সৌন্দর্য সভ্যতা ও নাগরিক রুচিবোধের প্রথম পরিচয় মেলে তার রাস্তাঘাটের পরিচ্ছন্নতায়। অথচ আমাদের নগরজীবনে ডাস্টবিনের চেয়ে রাজপথের পাশের খোলা জায়গাই যেন বর্জ্য ফেলার প্রধান স্থানে পরিণত হয়েছে। বাড়ির মেসের বা দোকানের প্রতিদিনের পচা উচ্ছিষ্ট ও আবর্জনা পলিথিনে মুড়িয়ে যত্রতত্র নির্দ্বিধায় ছুড়ে ফেলা হচ্ছে জনচলাচলের রাস্তার ধারে। নিজের ঘরটি ঝকঝকে পরিষ্কার রেখে ঘরের বাইরের অংশটুকু নোংরা করার এই মানসিকতা আমাদের সামষ্টিক অসচেতনতারই প্রতিফলন। আমরা ভুলে যাই যে সড়কটিকে আমরা ডাস্টবিন বানাচ্ছি সেই সড়ক দিয়েই আমাদের সন্তানরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায় আমরাই কর্মস্থলে যাতায়াত করি এবং সেই বাতাসেই আমরা নিশ্বাস নিই।
এই সংকটের সবচেয়ে রূঢ় ও অসহনীয় চিত্রটি চোখে পড়ে রংপুর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পার্কের মোড় থেকে লালবাগ পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তাটিতে। উত্তরাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজ এবং কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। একই সঙ্গে শাপলা চত্বর মেডিকেল এলাকা ও কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাওয়ার প্রধান পথও এটি। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুই ধার দিয়ে মাঝেমধ্যেই ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমে থাকতে দেখা যায়। পচা আবর্জনার উৎকট দুর্গন্ধে এই পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিংবা রিকশা ও অটোরিকশায় চলাচল করা রীতিমতো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। গন্ধে সেখানে একমুহূর্ত টেকা মুশকিল হয়ে পড়ে অনেক সময়।
রংপুরের এই বর্জ্য সংকট ও জনদুর্ভোগ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে গণমাধ্যমে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন প্রথম আলোতে প্রকাশিত রংপুর কি সবচেয়ে নোংরা শহরের নাম হবে শীর্ষক কলামে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ আক্ষেপ করে তুলে ধরেছেন কীভাবে ঢাকা থেকে রংপুর শহরে ঢোকার মুখে লালবাগে প্রধান সড়কের ওপর সরাসরি ময়লা ফেলা হচ্ছে এবং সড়কই যেন ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের রংপুরে সড়কের পাশে আবর্জনার স্তূপ পথচারীদের ভোগান্তি শীর্ষক প্রতিবেদনেও ঠিক একই চিত্র উঠে এসেছে। কারমাইকেল কলেজ সংলগ্ন লালবাগ এলাকায় রাস্তার পাশে জমে থাকা বর্জ্য সকালে সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে কিছু সরিয়ে নিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার তা আবর্জনায় ভরে যায়। শুধু লালবাগ বা পার্কের মোড়ই নয় আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত পথে পথে দুর্গন্ধ দুর্ভোগে মানুষ শীর্ষক সংবাদে দেখা যায় লালবাগ থেকে শুরু করে ঝন্টু মোড় মুন্সিপাড়া ও গুপ্তপাড়ার মতো এলাকাগুলোতেও পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে রাস্তার পাশেই খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এবং গরু কুকুর সেই ময়লা উল্টেপাল্টে পুরো সড়কে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো বছরের পর বছর ধরে চলা এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশের দায় কার এবং বর্তমান সময়েও কেন এর পরিবর্তন হচ্ছে না তা নিয়ে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮৫ কেজি কঠিন বর্জ্য তৈরি হয় অথচ মাত্র ১৫টি ওয়ার্ডে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ এবং রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের হারও অত্যন্ত নগণ্য।
রংপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্যমতে প্রতিদিন সংগৃহীত হয় মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ টন বর্জ্য আর বাকি বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পড়ে থাকে শহরের অলিগলি ও সড়কের ধারে। অন্যদিকে নাগরিকদের সদিচ্ছার অভাবও কম দায়ী নয় যেখানে ডাস্টবিন রয়েছে সেখানেও নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা না ফেলে সড়কের মোড়ে বা রাস্তার ধারে ময়লা ফেলার প্রবণতা দেখা যায় বলে আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উন্মুক্ত স্থানে এভাবে বর্জ্য পচে মশা মাছির বিস্তার ঘটছে যা ডায়রিয়া টাইফয়েড ও ডেঙ্গুর মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
সবচেয়ে ভয়ের জায়গাটি হলো আমাদের মনস্তাত্ত্বিক নীরবতা। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিক্ষক চিকিৎসক ও হাজারো সাধারণ মানুষ নাকে কাপড় গুঁজে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লালবাগ পর্যন্ত এই ময়লার ভাগাড় পেরিয়ে যাচ্ছেন। প্রথম কয়েক দিন হয়তো ক্ষোভ জন্মায় কিন্তু কিছুদিন পর সেটিই অভ্যাস হয়ে যায়। আমরা ধরেই নিই এ দেশের রাস্তা এমনই থাকবে বাতাসে এমন পচা গন্ধই ভাসবে। এই অস্বাভাবিক ও অস্বাস্থ্যকর একটি পরিবেশকে প্রশ্নহীনভাবে জীবনের অংশ করে নেওয়ার অর্থ চরম উদাসীনতার কাছে হার মেনে নেওয়া।
এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রথমত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লালবাগ পর্যন্ত পুরো সড়কসহ শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পর্যাপ্ত ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন ও সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বা এসটিএস স্থাপন করতে হবে এবং দিনের ব্যস্ত সময়ের আগেই বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে কঠোর নজরদারি ও জরিমানার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সর্বোপরি আমাদের নাগরিক হিসেবে নিজেদের আচরণ বদলাতে হবে এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে। প্রতিদিন দুর্গন্ধময় সড়ক পেরিয়ে আমাদের এই নীরব পথচলা প্রমাণ করে আমরা আসলে সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিইনি বরং চরম উদাসীনতার কাছে হার মেনে সমস্যাকেই মেনে নিয়েছি। এই মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি ভেঙে যেদিন আমরা নিজেরা যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধ করব এবং পরিচ্ছন্ন শহরের দাবিতে সোচ্চার হব কেবল সেদিনই আমাদের শহর ও পরিবেশ সত্যিকারের মুক্তি পাবে।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
