মিফতাহুল জান্নাত মৌমিতা:
জীবন আমাদের, অথচ জীবনের সিদ্ধান্তগুলো কতটা আমাদের নিজেদের? আমরা কোথায় যাব, কী পড়ব, কীভাবে সফল হব, কেমন মানুষ হয়ে উঠব—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কখনো কি আমরা নিজেদের কাছে জানতে চেয়েছি, আমি আসলে কী চাই?
আমাদের সমাজের অধিকাংশ পরিবারে একটি শিশুর জন্মের পরপরই তার পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে বাবা-মা, নির্ধারণ করে ফেলেন—শিশুটি বড় হয়ে কী হবে। একটু কথা বলতে শিখলেই তার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, ভবিষ্যতে তার কী হওয়া উচিত। বাংলাদেশের অধিকাংশ বাবা-মায়ের প্রত্যাশা, তাঁদের সন্তান হবে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। কখনো কখনো তাঁরা সন্তানকে প্রশ্ন করেন, “তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?” ছোট্ট, অবুঝ শিশুটির কণ্ঠে উত্তর আসে, “আমি ডাকতাল হতে চাই।” কিন্তু শিশুটির এই সরল উত্তরটি কি সত্যিই তার নিজের ইচ্ছার প্রকাশ, নাকি সে ইতোমধ্যে শিখে নিয়েছে যে তাকে কী হতে হবে? বাস্তবতা হলো, অনেক বাবা-মা হয়তো কখনো জানতেই চান না, কিংবা জানার চেষ্টাও করেন না, তাঁদের সন্তান আসলে কী হতে চায়।
যখন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তার নিজের ইচ্ছার পরিবর্তে অন্যের প্রত্যাশা দ্বারা নির্ধারিত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই নিজেদের জীবন যাপন করছি, নাকি অন্যের স্বপ্নকে নিজেদের জীবন হিসেবে গ্রহণ করছি?
আমরা এমন কিছু অর্জন করার জন্য ছুটে চলি, যার প্রকৃত অর্থ হয়তো আমাদের কাছেই অজানা। পরিবার, সমাজ কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের চাপে অনেক সময় নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলতে হয়। এমনকি সমাজের চোখে সফল হওয়ার জন্য নিজের অপছন্দের বিষয়টিকেও একসময় আপন করে নিতে হয়।
হ্যাঁ, সামাজিক জীব হিসেবে পরিবার ও সমাজ আমাদের জন্য অপরিহার্য। পরিবার ও সমাজ ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব অনেকাংশেই অসম্পূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সামাজিক সম্পর্ক ও প্রত্যাশার মূল্য দিতে গিয়ে কতবার আমাদের নিজেদের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিতে হয়? কতবার নিজের স্বপ্নের পরিবর্তে পূরণ করতে হয় পরিবারের স্বপ্ন, সমাজের মানুষের প্রত্যাশা?হয়তো জীবনের কোনো এক নিঃশব্দ মুহূর্তে আমরা নিজেদের কাছে ফিরে এসে প্রশ্ন করব—যে জীবন এতদিন যাপন করেছি, সেটি কি সত্যিই আমাদের ছিল? যে স্বপ্নগুলো পূরণ করতে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছি, সেগুলোর মধ্যে কতটুকু আমাদের নিজেদের আকাঙ্ক্ষা ছিল? অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে করতে কখনো কখনো আমরা নিজেদেরই হারিয়ে ফেলি। অথচ জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো সমাজের চোখে সফল হয়ে ওঠা নয়, বরং নিজের কাছে নিজের অস্তিত্বকে চিনতে পারা। পরিবারকে ভালোবাসা, সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন কিংবা অন্যের প্রত্যাশা পূরণ—এসবের মধ্যেও নিজের জন্য একটি জীবন থাকা প্রয়োজন। এমন একটি জীবন, যেখানে আমাদের সিদ্ধান্তগুলো কেবল অন্যের স্বপ্নের প্রতিফলন নয়, বরং আমাদের নিজস্ব চিন্তা, ইচ্ছা ও সত্তার প্রকাশ। কারণ, শেষ পর্যন্ত জীবন আমাদেরই; তাই সেই জীবনে নিজের অস্তিত্বটুকুও যেন আমাদেরই থাকে।
পিতামাতার প্রতি বিনীত আবেদন—সন্তানের মতামত ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দিন। নিজেদের প্রত্যাশা চাপিয়ে না দিয়ে, তার নিজস্ব স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করুন। কারণ, সন্তানের জীবন তার নিজের; আপনাদের দায়িত্ব সেই জীবনের সুন্দর বিকাশ নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
