শিরোনাম:
Network News BD
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ: বৈষ্ণব পদাবলী ও অন্যান্য

জয় চক্রবর্তী

জয় চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর ২০২৬, ৭:১৮ PM ২৩ বার পঠিত
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ: বৈষ্ণব পদাবলী ও অন্যান্য

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি সম্পাদিত

অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকাব্য
বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলী অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ গীতিকাব্য ধারা। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের (১৪৮৬-১৫৩৩) জন্মের আগের সময়কালকে ‘চৈতন্য-পূর্ব যুগ’ বলা হয় এবং পরবর্তী যুগকে ‘চৈতন্য-পরবর্তী যুগ’ বলা হয়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের মতো বৈষ্ণব পদাবলীর বিষয়বস্তুও রাধাকৃষ্ণকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। চৈতন্য-পূর্ব যুগের শ্রেষ্ঠ কবি বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস। চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পর গীতিকাব্য ধারায় একটি অন্যরকম জোয়ার আসে। চৈতন্যদেবের কৃষ্ণপ্রেমে মশগুল ভাব এবং লৌকিক জীবন বৈষ্ণব কবিদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। এ সময়কালে কবিগণ চৈতন্যদেবকে রাধা এবং কৃষ্ণের সম্মিলিত রূপ ‘গৌরাঙ্গ’ হিসেবে কল্পনা করেন এবং নতুন একটি পদের ধারা তৈরি করেন, যা ‘গৌরচন্দ্রিকা’ নামে প্রচলিত।

বৈষ্ণব পদাবলীর প্রায় সম্পূর্ণটাই ব্রজবুলি ভাষায় রচিত। ব্রজবুলি কোনো মানুষের মুখের ভাষা বা কোনো অঞ্চলের নির্দিষ্ট ভাষা নয়। মৈথিলী ভাষার সাথে বাংলা ভাষা মিলে ব্রজবুলির রূপ ধারণ করে। ব্রজবুলি ভাষার জনক মিথিলার (বর্তমান ভারতের বিহার ও নেপালের কিছু কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত) কবি বিদ্যাপতি। বৈষ্ণব পদাবলীর কবিগণ অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ও সংবেদনশীল ব্রজবুলি ভাষায় গীতিকাব্যটি রচনা করেন। বৈষ্ণব পদাবলীর কবিগণ রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনকে কয়েকটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে ভাগ করেন। পূর্বরাগ, অভিসার, মান, বিরহ, ভাব-সম্মিলন হলো উল্লেখযোগ্য পর্যায়।

বৈষ্ণব পদাবলী শত শত কবি মিলে রচনা করলেও চারজন কবিকে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করা হয়—বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস। প্রথম দুজন চৈতন্য-পূর্ববর্তী যুগের এবং বাকি দুজন চৈতন্য-পরবর্তী যুগের কবি। বৈষ্ণব পদাবলী রচনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম কবিও অংশগ্রহণ করেন, যাঁদের মধ্যে নাসির মাহমুদ, সৈয়দ সুলতান, শেখ কবির, আলাওল ও চাঁদ কাজী স্মরণীয়। এই সময়কালে জীবনী সাহিত্যেরও ব্যাপক প্রসার লক্ষ করা যায়। বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ ও কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কৈশোরে অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত ‘প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ’ গ্রন্থের মাধ্যমে বিদ্যাপতি ও গোবিন্দ দাসের ব্রজবুলি পদের প্রেমে পড়েন। প্রাচীন কবিদের অনুকরণে তিনি ‘ভানুসিংহ’ ছদ্মনামে জোড়াসাঁকো হতে প্রকাশিত ‘ভারতী’ পত্রিকায় ব্রজবুলি ভাষায় রচিত পদ প্রকাশ করতে থাকেন। পরবর্তীতে ১৮৮৪ সালে পদগুলো গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। সেই গ্রন্থের বিখ্যাত গান— “শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা, নিশীথযামিনী রে…।”

রোমান্টিক প্রণয় উপাখ্যান (মুসলিম কবিদের অবদান)
মধ্যযুগের প্রণয়োপাখ্যানে মুসলিম কবিদের অবদান অবিস্মরণীয়। ধর্মীয় ভাবধারা এবং রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের বাইরে সাহিত্যে একটি ভিন্ন জগৎ তৈরি করেন মধ্যযুগের মুসলিম কবিগণ। পঞ্চদশ শতাব্দীতে শাহ মুহম্মদ সগীর ‘ইউসুফ-জুলেখা’ রচনার মধ্য দিয়ে সাহিত্যে ভিন্ন ধারার উদ্বোধন করেন। এরপর ষোড়শ শতাব্দীতে দৌলত উজির বাহরাম খান ‘লাইলী-মজনু’ রচনার মাধ্যমে ভিন্ন মাত্রা দান করেন। এরপর ক্রমান্বয়ে সাবিরিদ খানের হানিফা-কয়রাপরী, মুহম্মদ কবীরের মধুমালতী, কোরেশী মাগন ঠাকুরের চন্দ্রাবতী এবং আলাওলের পদ্মাবতী রচিত হয়। একেবারে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত রোমান্টিক প্রণয় উপাখ্যান রচিত হতে থাকে। মূলত সুলতানি ও মুঘল আমলেই উল্লেখযোগ্য প্রেমের উপাখ্যান রচিত হয়েছে।

নাথ সাহিত্য, লোকসাহিত্য ও অন্যান্য
‘নাথ’ শব্দের অর্থ স্বামী বা প্রভু। বৌদ্ধ ধর্মের সহজিয়া মত ও শৈব ধর্মের নাথ পন্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক অতীন্দ্রিয় যোগসাধনা ও লৌকিক কাহিনীর ব্যতিক্রমী ধারা। ষোড়শ শতাব্দীতে শেখ ফয়জুল্লাহ ‘গোরক্ষবিজয়’ রচনা করেন, যা অন্যতম নাথ সাহিত্য। ভবানী দাস, দুর্লভ মল্লিক, সুকুর মাহমুদ প্রমুখ কবি লোকমুখে প্রচলিত গানগুলোকে সংগ্রহ করে কাব্যের রূপ দেন, যা ‘ময়নামতির গান’ বা ‘গোপীচন্দ্রের গান’ নামে পরিচিত। রাজা গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস গ্রহণ এই সাহিত্যের মূল উপজীব্য।

অবশেষে বাংলা মধ্যযুগের এই দীপ্ত পাঠশালা থেকে যখন আমরা চোখ ফেরাই, তখন মনে হয় এটি কেবল কিছু প্রাচীন গ্রন্থ বা ধূসর পাণ্ডুলিপির সমাহার নয়, এটি আবহমান বাংলার চিরন্তন ইতিহাসের এক প্রজ্জ্বলিত পটভূমি। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা-কৃষ্ণের মান-অভিমানের চিরন্তন বিরহ থেকে শুরু করে অনুবাদ সাহিত্যের রামায়ণ-মহাভারতের রাম, শ্রীকৃষ্ণ বা অর্জুনের ধর্মের জয় কিংবা মঙ্গলকাব্যের লৌকিক দেব-দেবীর কৃপাপ্রার্থনার আর্তনাদ—সমগ্রই যেন বাংলা ভাষার গৌরবোজ্জ্বল অতীত। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধার আকুলতা, রোমান্স ও কল্পনার সাথে ব্রজবুলি, মৈথিলী-ফারসির সংমিশ্রণে রচিত ভিন্নধারার প্রণয়োপাখ্যান কালক্রমে বাংলা ভাষাকে মজবুত করেছে, অলংকৃত করেছে।

মধ্যযুগের এই দীর্ঘ পথচলায় ভক্তি, বিরহ, প্রেম আর বিশ্বাসের যে আল্পনা আঁকা হয়েছিল, তা আজও আমাদের শেকড়কে ঋদ্ধ করে। এ সাহিত্য নিছক অতীতের ইতিহাস নয়; এটি বাঙালির চিরকালীন হাসিকান্না, প্রেম ও জীবনেরই এক শাশ্বত দলিল।

শুভ্র/

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!