মোঃ শরীফুল ইসলাম:
বাংলাদেশে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কেবল অপ্রত্যাশিতই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরিকল্পিত অপরাধ। এর ফলে সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সম্প্রতি গত ১০ অক্টোবর সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, চাকরিপ্রার্থীরা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে এসে পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে জানতে পারেন যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এই ঘটনা দেশের শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্নফাঁসের মতো অপসংস্কৃতি তরুণদের স্বপ্ন পূরণের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন মেধাবী এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা। অনেকেরই সরকারি চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। অথচ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল চাকরিতে অনিয়ম ও বৈষম্যের প্রতিবাদেই। এখন জনমনে প্রশ্ন জাগে, তরুণদের এত আত্মত্যাগের পরও কি নিয়োগ পরীক্ষায় বৈষম্য, অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁস কখনো শেষ হবে না?
চাকরিপ্রার্থীদের অনেকেরই আর্থিক অবস্থা বেশ নাজুক থাকে। কেউ টিউশনির টাকা জমিয়ে, কেউবা ধারদেনা করে পরীক্ষায় অংশ নিতে রাজধানীতে আসেন। শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় অসংখ্য চাকরিপ্রার্থীকে চরম আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেকের হয়তো সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা শেষের দিকে এবং এটিই ছিল তাঁদের শেষ সুযোগ। চাকরিপ্রার্থীদের এই চরম ভোগান্তির নেপথ্যে কারা এবং এর দায়ভারই বা কে নেবে?
প্রায় সব প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সঙ্গেই কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশ থাকে। এ ছাড়া যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়, সেগুলোর অনেকটিই এখনো সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত নয়। এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এবং প্রশ্নফাঁস রোধে দ্রুত বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রথমত, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা দ্বারা নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত ও দায়ী কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, প্রশ্ন প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শতভাগ স্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, প্রশ্নফাঁসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা যাচাই বাছাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সাধারণ পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে গিয়ে হয়রানির শিকার না হন। পঞ্চমত, নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি বাধ্যতামূলক করতে হবে। ষষ্ঠত, পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বক্ষণিক ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সর্বোপরি, দেশের প্রতিটি চাকরিপ্রার্থী একটি অবাধ, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন প্রতিযোগিতার পরিবেশ চান। মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে প্রশ্নফাঁসের এই চিরস্থায়ী সমাধান এখনই করতে হবে।
