শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

শিশুরা হবে আমাদের পরিবেশ রক্ষক

মাজেদুল ইসলাম আখিফ

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:৩১ AM ৫২ বার পঠিত
শিশুরা হবে আমাদের পরিবেশ রক্ষক

ছবি: সংগৃহীত

“নীল সবুজের আঙিনায় হরেকরকম পাখি
লাল আঁচলের সুরের দোলায় রাঙিয়ে তোলে আঁখি।”

এই আঁখি ঝোঁড়ানো শব্দের কথা শুনে তোমারও ইচ্ছে জাগতে পারে—কোথায় সে দেশ, কোথায় তার অবস্থান? সে বুঝি অচিন এক রাজ্য, যে সবুজের আঙিনায় প্রাকৃতিক নির্মলতায় বিদ্রোহী কবির মতো ঝাঁঝালো কবিরও চোখ জুড়িয়ে যায়। সবুজের দোলায়, পাখিদের আনাগোনায়, সূর্যের লাল আভায় প্রাকৃতিক সাম্যতার সেটি আর কোনো অচেনা রাজ্য নয় এটিই বাংলাদেশ।

একটা সময় ছিল, যখন সবুজ শ্যামল, ঘন বন, বৃক্ষরাজি ও জীববৈচিত্র্যে পূর্ণ ছিল আমাদের এই দেশ । প্রকৃতির কোমল কোলে পাখিরা গাইত, হিমেল মিষ্টি বাতাসে প্রজাপতি আর পক্ষিকুল উড়ে বেড়াত। বিকেলের লালচে আভায় শিল্পীরা আঁকতো ,নদীর কলকল ধ্বনিতে কবিরা ছন্দ ধরতো, আর লেখকরা তাদের উপাখ্যান খুঁজতো। তাদের বর্ণনার পাখি, ফুল, আকাশ, মাঠ ও ঋতুচক্রের রূপ ধরা জীবনের সাথে মিশে যেত।

তোমার কাছে এইসব এক কল্পনার রাজ্যের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু রবি ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ বা জসীমউদ্দীনের পল্লীপাড়ার কবিতার ছন্দগুলোকে কি তোমার কাছে অর্থহীন মনে হয়?

চলো, ফিরে যাই মূল আলোচনায়। বর্তমানের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জনসচেতনার অভাব, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে দেশের বনভূমি ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে। ফলে আমাদের এই সমুদ্রতীরবর্তী ব-দ্বীপ অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। বন ধ্বংসের কারণে শুধু প্রকৃতির ভারসাম্যই নষ্ট হচ্ছে না, একই সাথে বিলুপ্তির পথে বহু বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক উপাদান ।

সমুদ্র উপকূলীয় বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পারে জলবায়ু ও আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব। সেন্ট মার্টিন বা নারিকেল জিঞ্জিরা যার সমুদ্র তীরবর্তী মনোমুগ্ধকর কোরালগুলো একসময় বিস্ময়ে ভরিয়ে দিত দর্শনার্থীদের, অথচ আজ তা দেখা যেন সোনার হরিণ পাওয়ার মতো বিরল। সাগরের বেড়ে চলা লবণাক্ততা বিশিয়ে তুলছে উপকূলীয় মানুষদের।

সুন্দরবনের অবস্থাও কম ভয়াবহ নয়। রয়েল বেঙ্গল টাইগার , চিত্রা হরিণ , গঙ্গা নদীর ডলফিন, লোনা পানির কুমির ও রিডলি কচ্ছপ ছাড়াও অগণিত প্রাণীর আবাসস্থল এই বন। শহুরের জীবনের চাপ কাঠিয়ে প্রাকৃতিক নির্যাস ও প্রশান্তির খুঁজে আমরা বারবার হারিয়ে যেতে চাই এই প্রকৃতির মাঝে-প্রশান্তির খোঁজে। কিন্তু আমরা যেভাবে গাছ কেটে আসবাবপত্র এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য দালানঘর নির্মাণ করতে শুরু করেছি, তাতে প্রকৃতির কাছে প্রশান্তির খোঁজে যাওয়া তো দূরে থাক, নিজেদের অস্তিত্বকেই সংকটাপন্ন করছি।

বন থেকে বনায়নের সংজ্ঞা—আমরা যা করি না কেন, তা হওয়া চাই পরিকল্পিত। চলো, তার কারণগুলো দেখে নেওয়া যাক। ইউক্যালিপটাস নামক এক ধরনের গাছ পাওয়া যায়। ধরো তুমি গাছ লাগাতে অনুপ্রাণিত হয়ে কোনো নার্সারি থেকে স্বল্প দামে অনেকগুলো ইউক্যালিপটাস গাছ এনে বাড়ির বাগানে রোপণ করলে। কয়েক বছর পর দেখলে তোমার বাগানের অন্যান্য গাছগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে মারা গেল। তাহলে কি আর বনায়ন হলো?

“গাছ একটি কাটলে দুটি লাগাও” এই স্লোগান আমরা প্রায় শুনে থাকি , কিন্তু তা আংশিক সত্য হলেও পুরোপুরি নয়। কেননা, পরিকল্পিত বনায়ন ছাড়া কোনো দিনই আমরা এই ঘাটতিগুলো পূরণ করতে পারি না। তাই সচেতনতা কে মাপকাঠি ধরে, পরিকল্পনামাপিক উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত প্রজাতির বৃক্ষরোপণ এবং সেগুলোর সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি বনাঞ্চল তৈরি করে নিজেদের কার্বন-নিরপেক্ষ মানুষের জায়গায় নিয়ে আসতে পারি। এই ক্ষেত্রে ফলদ গাছ ও পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ তাকে অন্য মাত্রা দিতে পারে।

চলো, এক কার্বন-নিরপেক্ষ শিশুর গল্প শোনা যাক।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের তামিলনাড়ুর শিশু আদাভি, যার ডাকনাম নোভা। মাত্র ২ বছর বয়সেই পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই শিশু ও তার পরিবার। তার বাবা-মা তাদের সন্তানের সারাজীবনভর কার্বন নিঃসরণের ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে ঠিক রাখতে ৬ হাজার ফলদ গাছ রোপণ করেছেন। যা পরিকল্পিত বনায়নের একটি বাস্তব উদাহরণ। এ উদ্যোগের জন্য আদাভি এশিয়া বুক অব রেকর্ডস থেকে ‘বিশ্বের প্রথম কার্বন-নিরপেক্ষ শিশু’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করি। গাছ পরিবেশের সাথে মিশে যাওয়া এই ক্ষতিকারক কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নেয়। তবে দিন দিন নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে মানুষের চেয়ে গাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাতাসে কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে কার্বন-নিরপেক্ষ মানুষরা বাতাসে কার্বনের পরিমাণ কমিয়ে আনেন, পরিবেশকে রাখেন দূষণমুক্ত।

বাংলাদেশের প্রথম ‘কার্বন-নিরপেক্ষ শিশু’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে আয়ান খান রুহাব, যার বর্তমান বয়স মাত্র ৮ মাস। তার বাবা-মা সাতক্ষীরার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৫৮০টি ফলদ ও বনজ গাছ রোপণ করেছেন। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল—বিশেষত সাতক্ষীরা, খুলনা ও ভোলার মানুষজন জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি শিকার। এই অবস্থায় যদি ব্যক্তি পর্যায়েও কেউ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উদ্যোগ নেয়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো পদক্ষেপ।

এই প্রেক্ষাপটে কোনো শিশুকে ঘিরে কার্বন-নিরপেক্ষ ঘোষণা কেবল প্রতীকী নয়; এটি জলবায়ু সচেতনতার এক নতুন সূচনা। এতে করে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হবে। এটি শিশুর জন্মের মুহূর্ত থেকেই শিশুর প্রতি এক বিশেষ দায়িত্ববোধ তৈরি করে।

কার্বন-নিরপেক্ষ মানুষরা পৃথিবীতে ভারসাম্য রক্ষা করেন, যেখানে তাদের নিঃসৃত কার্বনের পরিমাণ এবং গাছ বা প্রকৃতির মাধ্যমে শোষিত কার্বনের পরিমাণ সমান থাকে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ থাকে।এবং পৃথিবী সবুজায়নের দিকে দিন দিন অগ্রসর হয়।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন বলছে, একজন ভারতীয় মাথাপিছু বার্ষিক প্রায় ২ টন কার্বন নিঃসরণ করেন। তার তুলনায় একজন বাংলাদেশি বার্ষিক ০.৭ টন কার্বন নিঃসরণ করেন। এই কার্বন নিঃসরণ ভারতীয়দের অর্ধেকেরও কম হলেও, জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি মোট কার্বন নির্গমনে বিশাল ভূমিকা রাখে। তাই এই বিষয়ে আমাদের আরও বেশি সচেতন হওয়া দরকার।

বাংলাদেশ একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের দেশ হওয়ায় দেশের ২০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। আমরা জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ফসলি জমিতে লবণাক্ততা, প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণের মতো নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগেই এই সমস্যাগুলো সমাধান সম্ভব নয়।

তবে, আমাদের মতো শিশুরা যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে বিকল্প পরিবেশবান্ধব কাজ—যেমন বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায়—এগিয়ে এসে নিজেদের কার্বন-নিরপেক্ষ মানুষের তালিকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করি, তাহলে এটি হবে আমাদের জন্য দেশপ্রেম, দেশরক্ষা, পৃথিবীরক্ষা এবং সবুজায়নের একটি অনন্য উদাহরণ।

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!