শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

জলবায়ু সংকট : অদৃশ্য বিপর্যয়ের পথে বাংলাদেশ

সুমনা আক্তার 

প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০২৬, ৫:১২ PM ১৭ বার পঠিত
জলবায়ু সংকট : অদৃশ্য বিপর্যয়ের পথে বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

কল্পনা করুন, ২০৫০ সাল। বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলো অর্ধেক পানির নিচে, ঢাকার তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে, সুন্দরবন বলে কিছু নেই। এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আর সেই ভবিষ্যতের আভাস আমরা পাচ্ছি এখনই। ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রেকর্ড তাপপ্রবাহে বাংলাদেশের ঢাকা, রাজশাহী, ফরিদপুর ও পাবনায় তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। রাস্তায় বেরোনো দায়, শ্রমজীবী মানুষের জীবন অতিষ্ঠ, হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ। এটি কোনো কাকতালীয় নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে অবহেলিত জলবায়ু সংকটের ক্রমবর্ধমান প্রতিশোধ। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। জার্মানওয়াচ এর গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের শীর্ষ দশের মধ্যে অবস্থান করছে। এর মূল কারণ দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, নিম্নভূমি অঞ্চল, ঘনবসতি এবং নদীনির্ভর জীবনব্যবস্থা। অথচ এই সংকট তৈরিতে বাংলাদেশের নিজের অবদান নগণ্য। বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের এক শতাংশেরও কম আসে এই দেশ থেকে। এটিই সবচেয়ে বড়ো অবিচার। আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যানেলের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ইতোমধ্যে প্রায় ১.১ থেকে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের দিন ১২ গুণেরও বেশি বেড়েছে। শহরাঞ্চলে আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট-এর কারণে তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়ে থাকে। বৃষ্টিপাতের ধরনও পাল্টে গেছে। আগে যেখানে মৌসুমি বৃষ্টি একটি নির্দিষ্ট সময়ে হতো, এখন সেখানে অনিয়মিত ও অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। ফলে একদিকে আকস্মিক বন্যা, অন্যদিকে দীর্ঘ খরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারাচ্ছে, কৃষক হারাচ্ছেন ফসল। বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি লবণাক্ততার কারণে কৃষির অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বরগুনায় এর প্রভাব স্পষ্ট। লক্ষাধিক মানুষ জলবায়ু উদ্‌বাস্তু হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততায় এই বনভূমি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। সুন্দরবন ধ্বংস হলে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, উপকূলীয় কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষাও বিলীন হয়ে যাবে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশার বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে ৪০০-এরও বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং ৭৮,০০০ এরও বেশি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাহলে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? প্রথমত, সরকারি পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো  এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে। উপকূলীয় বাঁধ ও সুরক্ষা অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক বর্জন এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ আদায়ে বাংলাদেশকে আরও সোচ্চার হতে হবে কারণ এই সংকটের জন্য দায়ী তারা, ভুক্তভোগী আমরা। জলবায়ু সংকট এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়। এটি আজকের জ্বলন্ত বাস্তবতা। ২০২৬ সালের এই দহনকাল আমাদের সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। সময় থাকতে সাড়া না দিলে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা শুধু একটি উত্তপ্ত, বিপন্ন ভূমিই রেখে যাব।

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!