বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশের তাপমাত্রা কোথাও কোথাও ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে— যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ রেকর্ড। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছরই গরমের তীব্রতা বাড়ছে এবং তাপপ্রবাহের স্থায়িত্বও দীর্ঘ হচ্ছে। এই নির্মম দাবদাহে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন রিকশাচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক ও ভ্রাম্যমাণ হকারের মতো শ্রমজীবী মানুষেরা। তবু জীবিকার টানে তীব্র রোদের মধ্যেই তাদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। বিশ্রাম নেওয়ার বিলাসিতা তাদের নেই— কারণ একদিন কাজ না করলে সেদিনের খাবার জোটে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি তাপপ্রবাহে দেশে ইতোমধ্যে শতাধিক মানুষ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের বড়ো অংশই খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৩৫ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষত যারা শারীরিক পরিশ্রম করেন তাদের জন্য। অথচ এই মানুষগুলোর জন্য ন্যূনতম সুরক্ষার ব্যবস্থাও নেই।
শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, তীব্র গরমে রাস্তা ফাঁকা থাকায় রিকশাচালক ও হকারদের আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একদিকে উপার্জন কমছে, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি— এই দ্বিমুখী চাপে তাদের পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধ পরিবারের সদস্যরাও এই তাপপ্রবাহে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কিন্তু চিকিৎসার সামর্থ্য নেই বলে অনেকেই ঘরে কষ্ট সহ্য করছেন।
এই সংকট মোকাবেলায় সরকারের কাছে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। প্রথমত, শহরের ব্যস্ত এলাকাগুলোতে বিনামূল্যে সুপেয় পানি ও খাবার স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুপুরের তীব্র রোদে শ্রমজীবীদের বিশ্রামের জন্য ছায়াযুক্ত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমজীবী পরিবারগুলোর জন্য জরুরি খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি অবিলম্বে চালু করতে হবে। চতুর্থত, নির্মাণ ও শিল্পখাতে দুপুর ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক বিশ্রামের নিয়ম চালু করতে হবে এবং নিয়োগকর্তাদের শ্রমিকদের জন্য পানি ও ছায়ার ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
যে মানুষগুলো রোদে পুড়ে এই শহরকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাদের বাঁচানোর দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই। তাপদাহ প্রাকৃতিক হলেও এই মানুষগুলোর দুর্ভোগ সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব— যদি সদিচ্ছা থাকে। এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারো নেই।
শুভ্র/
