মো. সেলিম হাসান দুর্জয়:
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই রাষ্ট্রের জন্ম কোনো রাজবংশের উত্তরাধিকার, কোনো ধর্মীয় আধিপত্য কিংবা কোনো ভৌগোলিক দুর্ঘটনার ফলে হয়নি; বরং একটি ভাষা ভিত্তিক জাতিসত্তা, রাজনৈতিক আত্ম নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা এবং মানব মর্যাদার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। সেই কারণেই বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পর, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে উপস্থিত হয়—
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি সত্যিই এই রাষ্ট্রীয় আদর্শকে ধারণ করতে পেরেছে?
প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গভীর অনুসন্ধান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Gabriel Almond এবং Sidney Verba রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন নাগরিকদের রাজনৈতিক মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আচরণের সমষ্টি হিসেবে। একটি রাষ্ট্রের সংবিধানে যে আদর্শ লেখা থাকে, তা তখনই কার্যকর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয় যখন তা জনগণ, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংবিধানের আদর্শ ও রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে প্রায়ই একটি গভীর দুরত্ব বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হলেও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার হয়েছে। গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও বিরোধী মতকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা গেছে। জাতীয়তাবাদের কথা বলা হলেও জাতীয় পরিচয়কে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় আদর্শ একটি সাংবিধানিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থেকেছে; রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি।
কেন গড়ে ওঠেনি একটি সর্বসম্মত জাতীয় ঐক্যসূত্র?
জাতি গঠনের তত্ত্বে Benedict Anderson জাতিকে একটি “Imagined Community” বা কল্পিত ঐক্যসম্পন্ন রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার সদস্যরা কিছু মৌলিক ঐতিহাসিক সত্য ও মূল্যবোধকে নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে ঐকমত্য থাকলেও তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ঐকমত্য গড়ে উঠেনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামরিক শাসন, সাংবিধানিক সংশোধন, দলীয় ইতিহাস নির্মাণ এবং ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকেও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত করেছে। ফলে জাতীয় ইতিহাস অনেক সময় দলীয় ইতিহাসে রূপান্তরিত হয়েছে। যে ইতিহাস জাতিকে একত্র করার কথা ছিল, তা কখনও কখনও বিভাজনের উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষমতার পরিবর্তনে জাতীয় চেতনার বৈপরীত্য কেন?
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “Politics of Memory” বা স্মৃতির রাজনীতি। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই অতীতকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে ব্যবহার করে।
বাংলাদেশে একইভাবে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় বয়ানের পরিবর্তন ঘটেছে। এক সরকার যে ব্যক্তিত্বকে জাতীয় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, অন্য সরকার তার গুরুত্বকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছে। এক সরকার যে ঘটনাকে জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে, অন্য সরকার সেই ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে।
এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, তুরস্ক কিংবা পোলান্ড —অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই ইতিহাস ও স্মৃতি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। তবে পরিণত গণতন্ত্রগুলোতে কিছু মৌলিক জাতীয় প্রশ্নকে দলীয় বিতর্কের বাইরে রাখার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো সেই পরিপক্বতায় পৌঁছাতে পারেনি।
মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কেন রাজনৈতিক বিভেদের শিকার?
একজন মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক, শিল্পী কিংবা বুদ্ধিজীবী মূলত একটি জাতির সম্পদ। কিন্তু যখন রাজনৈতিক আনুগত্য তার মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত হয়, তখন ব্যক্তি নয়, তার রাজনৈতিক অবস্থানই মূল্যায়নের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
এটি রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সংকট।
আধুনিক গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ও সরকার এক বিষয় নয়। সরকার পরিবর্তিত হয়, রাষ্ট্র থাকে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় সম্মান ও দলীয় আনুগত্যের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে জাতীয় সম্পদসম ব্যক্তিত্বদেরও রাজনৈতিক চশমায় দেখা হয়। এর ফলে জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয় এবং প্রজন্মের কাছে বিভ্রান্তিকর বার্তা পৌঁছায়।
মৃত্যু কি বিভেদ অতিক্রম করতে পারে?
সভ্য সমাজে মৃত্যু সাধারণত রাজনৈতিক বিরোধের সমাপ্তি ঘটায়। কারণ মৃত্যুর পর ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান নয়, তার সামগ্রিক অবদান মূল্যায়িত হওয়ার কথা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে, তখন মৃত্যু-পরবর্তী মূল্যায়নও নিরপেক্ষ থাকে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় এখন ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। এটি গণতন্ত্রের শক্তির নয়; বরং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার লক্ষণ।
একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মতের বিরোধ থাকবে, কিন্তু মৃত্যুর পর একজন মানুষের অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মানবিক ও জাতীয় ঐকমত্য বজায় থাকবে।
জাতীয় চেতনা কি দলীয় মতাদর্শের ঊর্ধ্বে হতে পারে?
আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্ব বলছে—হ্যাঁ, হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক দর্শনে মতপার্থক্য থাকবে। কেউ উদারবাদে বিশ্বাস করবে, কেউ সমাজতন্ত্রে, কেউ রক্ষণশীলতায়, কেউ জাতীয়তাবাদে। কিন্তু রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত এবং মৌলিক সাংবিধানিক মূল্যবোধ সাধারণত জাতীয় ঐকমত্যের ক্ষেত্র হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মুক্তিযুদ্ধ সেই জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তি হতে পারত এবং এখনও হতে পারে।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার বনাম রাজনৈতিক নিলজ্জতা
রাজনৈতিক শিষ্টাচার বলতে বোঝায় মতভিন্নতাকে স্বীকার করার সক্ষমতা, প্রতিপক্ষের বৈধতাকে মেনে নেওয়া, জাতীয় প্রশ্নে ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। অন্যদিকে রাজনৈতিক নিলজ্জতা তখনই প্রকাশ পায় যখন— ইতিহাসকে দলীয় স্বার্থে বিকৃত করা হয়; জাতীয় বেদনা ও গৌরবকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়; মৃত ব্যক্তিকেও রাজনৈতিক বিভাজনের উপাদান বানানো হয়; রাষ্ট্র ও দলকে অভিন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; বিরোধিতাকে শত্রুতায় রূপান্তরিত করা হয়।
জাতীয় পুনর্মিলন ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের প্রশ্নটি আজ বাংলাদেশের জন্য কেবল রাজনৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেও পরিণত হয়েছে। মত ও পথের ভিন্নতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু জাতীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করাই পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তা যেন জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র, সহনশীল রাজনৈতিক আচরণ, ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভিন্নমতের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়েই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় চেতনা গড়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য এই রাজনৈতিক পরিপক্বতার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস একটি মুক্তির ইতিহাস; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাস এখনো পূর্ণ মুক্তির ইতিহাস হয়ে উঠতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় মূলনীতির প্রতি আনুগত্যের চেয়ে অনেক সময় দলীয় আনুগত্য বড় হয়ে উঠেছে। ফলে জাতীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ বারবার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ময়দানে টেনে আনা হয়েছে।
২০২৬ সালে এসে একটি মৌলিক সত্য আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন—গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হলো শিষ্টাচার, সহনশীলতা এবং জাতীয় ঐকমত্য। যে দিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো উপলব্ধি করবে যে রাষ্ট্র কোনো দলের নয়, জাতির; মুক্তিযুদ্ধ কোনো গোষ্ঠীর নয়, সমগ্র জনগণের; এবং ইতিহাস কোনো নির্বাচনী ইশতেহার নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়—সেদিন রাজনৈতিক শিষ্টাচার বাস্তবতা হবে, আর রাজনৈতিক নিলজ্জতা ইতিহাসের প্রান্তিক টীকায় পরিণত হবে।
সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর।
শুভ্র/
