সমাজে অপরাধ – অনিয়ম অথবা যেকোনো সামাজিক ব্যাধি বাড়লেই, আমাদের প্রথম দাবি ওঠে, কঠোরতর আইনের অথবা নতুন আইন প্রণয়নের। কিন্তু আইন প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা মাত্র, প্রতিরোধের উৎস নয় কিন্তু। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচার নিশ্চিত করাই আইনের কাজ; সমাজ গঠন অথবা সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে নিয়মিত অনিয়মের প্রতিরোধ তার মূল দায়িত্ব নয়। তাই কিশোর অপরাধের এই পুনরাবৃত্তির নিয়মিত অনিয়মের শেকড় কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি; এমনকি বিদ্যমান আইনের অপর্যাপ্ততার জন্যও নয় বরং সমাজের অভ্যন্তরীণ পচনে। এমনকি বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনসংখ্যার বিশাল অংশ তরুণ-কিশোর, অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে জনমিতিক লভ্যাংশ। এই বিপুল শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু আমাদের কিশোর সমাজ আজ খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সাইবার বুলিং ও গ্যাং কালচারের ভয়ংকর পথে হাঁটছে। যে প্রজন্মের কাঁধে আগামীর রাষ্ট্র, তারা যদি ধ্বংসের অতলে তলিয়ে যায়, জাতি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।
তাহলে একটু সবাই মিলে, খোঁজ করি, কিশোর অপরাধের শেকড়গুলো:
পরিবার: প্রথম পাঠশালা এবং প্রথম ব্যর্থতা:
শিশুর প্রথম পাঠশালা কোনো বিদ্যালয় নয় বরং পরিবার। সেখানে মূল্যবোধ শিখতে ব্যর্থ হলে সে দ্রুতই বিপথে যায়। স্নেহ অমূল্য কিন্তু অন্ধ স্নেহ বিষাক্ত। অতীতের যৌথ পরিবারে শাসন ও স্নেহের ভারসাম্য ছিল; যেকোনো বয়োজ্যেষ্ঠ সন্তানকে শাসন করতে পারতেন। আজকের একক পরিবারে ব্যস্ত পিতা-মাতা সময়ের ঘাটতির বিপরীতে সন্তানকে গ্যাজেট দিয়ে থাকে, যেটি মনোবিজ্ঞানের ভাষায় “গিল্ট প্যারেন্টিং”। এর পরিণতি মারাত্মক। সন্তান কখনো ‘না’ শব্দটির মুখোমুখি হতে শেখে না, শেখে না প্রত্যাখ্যান কিংবা কোনো ব্যর্থতা সহ্য করতে। জীবনের ছোটখাটো প্রতিকূলতাতেই তারা ভেঙে পড়ে বা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন শিক্ষক ক্লাসরুমে ভুল শুধরে দিতে শাসন করলে পিতা-মাতা উল্টো শিক্ষককেই অপমান করেন। অথচ একসময় সমাজে কদরের সাথে পালিত হতো “শিক্ষাগুরুর মর্যাদা”। স্বয়ং আমার নিজের জীবনও গড়ে উঠেছে শিক্ষকদের সেই অনুশাসনের পথ ধরেই।
পরিবারের এই ভুল আশকারাই সন্তানের মনে অহংকার, সহনশীলতাহীনতা ও বেপরোয়া মানসিকতার প্রথম বীজ রোপণ করে। একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে পরিবারকেই আবার শাসনের সাথে স্নেহের সেই চিরন্তন সামঞ্জস্য ফিরিয়ে আনতে হবে।
পরিচয় সংকট, সম্মান, স্বীকৃতি এবং মিডিয়ার গ্ল্যামারের নেতিবাচক প্রভাব:
বয়ঃসন্ধিকাল হলো আত্মপরিচয় খোঁজার এক সময়, যখন কিশোর নিজেকে আর শিশু ভাবতে চায় না, চারপাশ থেকে চায় প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সম্মান ও স্বীকৃতি। তবে ইতিবাচক উপায়ে বা সুস্থ মাধ্যমে সেই স্বীকৃতি না পেলে, তারা দ্রুতই নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর পথ বেছে নেয়। একসময় গুরুজনদের প্রতি যে স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা ও বিনয় ছিল, আজ অনেক ক্ষেত্রেই তার জায়গা নিয়েছে একধরনের কৃত্রিম ঔদ্ধত্য। নিয়ম কিংবা আইন অমান্য করাকেই অনেক কিশোর বীরত্ব ও স্বাধীনতার প্রতীক বলে মনে করে। এই নৈতিক অবক্ষয়ে চরম ঘি ঢালছে আধুনিক মিডিয়া। বর্তমান সিনেমা ও ওয়েব সিরিজগুলোতে প্রায়শই অপরাধীকে নায়কের আসনে বসানো হচ্ছে; সহিংসতার মোড়কে অপরাধ জগৎকে দেখানো হচ্ছে একধরনের গ্ল্যামারাস ও আকর্ষণীয় জীবন হিসেবে। এর পাশাপাশি টিকটক বা রিলসের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে কিশোররা মেতে উঠেছে উগ্রতা ও পেশিশক্তির বিকৃত প্রদর্শনীতে। প্রতিবার স্ক্রিনে ভেসে ওঠা লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের কৃত্রিম ডোপামিন তাদেরকে আরও বেশি বেপরোয়া, বিপজ্জনক ও নিয়ন্ত্রণহীন কাজের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে আত্মপরিচয়ের ভুল সন্ধান, ভার্চুয়াল জগতের হাতছানি আর মিডিয়ার বিকৃত গ্ল্যামার মিলে আমাদের কিশোরসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর অন্ধকার গলিতে। এই পথ থেকে তাদের ফেরাতে প্রয়োজন পারিবারিক সুসম্পর্ক, সঠিক নির্দেশনা এবং সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা।
কংক্রিটের খাঁচা ও আপেক্ষিক বঞ্চনা
অপরিকল্পিত নগরায়নের যাঁতাকলে পিষে গেছে খেলাধুলার উন্মুক্ত মাঠ ও প্রাণবন্ত শৈশব। পরিবেশগত মনস্তত্ত্বের (Environmental Psychology) ধারণা অনুযায়ী, ইট-কাঠের এই “কংক্রিটের খাঁচা” কিশোরদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে অবরুদ্ধ করে দিচ্ছে। ফলে সুস্থ শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ না পেয়ে তাদের ভেতরে জমে থাকা উদ্বৃত্ত শক্তি (Pent-up energy) কোনো ইতিবাচক পথ পাচ্ছে না; যা দিনশেষে রূপ নিচ্ছে গলির মোড়ের আড্ডায়, আচরণগত উগ্রতায় কিংবা স্ক্রিনের নীল আলোর অন্ধকারে।
মানসিক ও সামাজিক এই অবক্ষয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সোশ্যাল মিডিয়া সৃষ্ট “আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ” (Relative Deprivation)। মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঞ্জারের “সোশ্যাল কম্প্যারিজান থিওরি” (Social Comparison Theory) অনুযায়ী, মানুষ স্বভাবতই নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করার প্রবণতা রাখে। ভার্চুয়াল জগতে সহপাঠী বা পরিচিতদের প্রদর্শন করা ঝলমলে জীবন, দামি গ্যাজেট ও কৃত্রিম বিলাসিতা দেখে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের কিশোররা তীব্র হীনমন্যতা ও সামাজিক অসন্তোষে ভুগতে শুরু করে।
এই মনস্তাত্ত্বিক সংকট কীভাবে কিশোর অপরাধে রূপ নেয়, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলে সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টনের “স্ট্রেইন থিওরি” (Strain Theory) থেকে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন সমাজ একজন কিশোরের মনে বস্তুগত সফলতা ও বিলাসবহুল জীবনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে, কিন্তু তা অর্জনের বৈধ ও বৈষম্যহীন সুযোগ রুদ্ধ থাকে, তখন তার মধ্যে তীব্র মানসিক ও সামাজিক চাপ বা “স্ট্রেইন” তৈরি হয়। আর এই সামাজিক চাপ থেকেই তথাকথিত “উঁচু মর্যাদা” ও বিলাসিতা পাওয়ার জন্য কিশোররা অতি দ্রুতই ভুল পথ, শর্টকাট কিংবা অপরাধের দিকে ধাবিত হয়
জুয়া, মাদক ও ক্ষমতার মোহ: ধ্বংসের ত্রিভুজ:
তিনটি ভয়ংকর শক্তি আজ আমাদের কিশোর সমাজকে তিলে তিলে গ্রাস করছে, অনলাইন জুয়া, সিন্থেটিক মাদক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহ। এই তিনের বিষাক্ত সংযোগেই তৈরি হয়েছে এক মরণঘাতী “ধ্বংসের ত্রিভুজ”।
প্রথমত, মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সির সহজলভ্যতায় অনলাইন জুয়া এখন কিশোরদের হাতের মুঠোয়। রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার এই কৃত্রিম মোহ তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক সর্বগ্রাসী চক্রে। জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে ঋণের দায় মেটাতে তারা প্রথমে চুরি-ছিনতাই এবং পরবর্তীতে নৃশংস খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়ত, ইয়াবা ও আইসের (Crystal Meth) মতো মারাত্মক সিন্থেটিক মাদক কিশোরদের মগজ ও হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নিচ্ছে। মাদকের বিষাক্ত প্রভাবে মানসিক সুস্থতা হারিয়ে তারা আজ টাকার জন্য নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতাকেও হত্যা করতে দ্বিধা করছে না।
তৃতীয়ত, জুয়া ও মাদকের এই অন্ধকার জগতকে সুরক্ষা দিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের তৈরি “বড় ভাই” কালচার। সমাজবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ডের “ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন থিওরি (Differential Association Theory)” স্পষ্ট করে যে, অপরাধ কোনো জন্মগত বিষয় নয়; বরং ভুল সঙ্গ ও পরিবেশ থেকেই কিশোররা তা শেখে। এই তথাকথিত বড় ভাইয়েরা কিশোরদের নিজেদের রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আইনি ও সামাজিক ছত্রচ্ছায়া পেয়ে এই কিশোররা নিজেদের “আইনের ঊর্ধ্বে” ভাবতে শুরু করেছে; গড়ে তুলছে পাড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাং, ত্রাস আর চাঁদাবাজির অভয়ারণ্য।
অনলাইন জুয়ার ঋণ, মাদকের আসক্তি আর “বড় ভাইদের” আশকারা, এই তিনের চক্রবূহ্যেই আজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
ভোক্তা প্রজন্ম, উদ্ভাবক নয়: প্রযুক্তি আজ শিশু-কিশোরদের হাতের মুঠোয়, কিন্তু তার ব্যবহার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে কেবল সস্তা বিনোদনে। টিকটক, রিলস কিংবা শর্ট ভিডিওর অ্যালগরিদম ক্রমাগত যে অস্বাভাবিক ডোপামিন নিসৃত করে, তা মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় শিশুদের “পপকর্ন ব্রেইন (Popcorn Brain)” তৈরি করছে, যার ফলে জটিল চিন্তা করা বা দীর্ঘ সময় কোনো কিছুতে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা তাদের দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে চরম বৈষম্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উন্নত বিশ্বের শিশুরা শৈশব থেকেই প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানিয়ে প্রোগামিং শেখে, রোবট তৈরি করে কিংবা গেম ডেভেলপ করে; অথচ আমাদের কিশোররা সেখানে কেবল অন্যের তৈরি গেমের অন্ধ গ্রাহক কিংবা কনটেন্টের নিষ্ক্রিয় ভোক্তা (Passive Consumer)। প্রযুক্তি তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার বদলে অলস ও নির্ভরশীল করে তুলছে।
এই সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার মূল দায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার। তত্ত্বভিত্তিক ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক এই পাঠ্যক্রম কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারে কোনো সৃজনশীল দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি। ফলে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা এক বিশাল প্রযুক্তিপ্রীতি প্রজন্ম তৈরি করছি ঠিকই, তবে তারা শুধুই প্রযুক্তির নিরবচ্ছিন্ন ভোক্তা, কোনো অর্থবহ উদ্ভাবক নয়।
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন: অপরাধের নেপথ্যে ক্ষমতার ছায়া:- রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বই একটি দেশের মূল্যবোধ, আইনি শাসন ও নীতি-নির্ধারণ পরিচালনা করে; কিন্তু সেই নেতৃত্ব যখন নিজেই অপরাধপ্রবণ ও বিপথগামী হয়ে পড়ে, তখন জাতির নৈতিক পতন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। আজকের কিশোর গ্যাং সৃষ্টি, এদের প্রতিপালন ও গ্ল্যামারাইজেশনের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার কথা প্রায় সকল জাতীয় আলোচনা ও গবেষণায় উন্মোচিত। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রাজনীতি (Patron-Client Politics)” যেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিল করতে বেপরোয়া ও বিভ্রান্ত কিশোরদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করে। রাজনৈতিক অঙ্গসংগঠনের কথিত ‘বড় ভাই’রা প্রথমে এসব কিশোরদের একত্রিত করে অপরাধে উৎসাহিত করে, আর পরবর্তীতে নিজের ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে আইনি হাত থেকে উদ্ধার করে বনে যায় “ত্রাণকর্তা”। এই কৃত্রিম আশ্রয়ের ফান্দে ফেলেই কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দাস বানিয়ে ফেলা হয়; মিছিল-মিটিংয়ে ভিড় বাড়ানো থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ দমন, দখলদারি ও চাঁদাবাজির মতো সহিংস কাজে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের এই বিষাক্ত ছত্রছায়া যতক্ষণ না উপড়ে ফেলা যাবে, ততক্ষণ হাজারো আইন বা পুলিশি অভিযানে কিশোর গ্যাং কালচার রোধ করা সম্ভব নয়, কারণ যে হাত অপরাধ লালন করে, সে হাত কখনো বিচার নিশ্চিত করতে পারে না।
উত্তরণের রূপরেখা: খণ্ডিত নয়, চাই সামগ্রিক সংস্কার
কিশোর অপরাধ বা নৈতিক অবক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি পরিবার, সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যর্থতার ফসল। তাই এই বিষাক্ত চক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রতিটি সংকটের বিপরীতে নিতে হবে সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পদক্ষেপ:
১. “গিল্ট প্যারেন্টিং” থেকে সচেতন অভিভাবকত্বে প্রত্যাবর্তন: পারিবারিক পর্যায় থেকেই এই সংস্কারের সূচনা হতে হবে। ব্যস্ততার ঘাটতি গ্যাজেট দিয়ে মেটানোর সংস্কৃতি বন্ধ করে সন্তানকে মানসম্পন্ন সময় দিতে হবে। অন্ধ স্নেহের বদলে টানতে হবে অনুশাসনের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই “না” শোনার শিক্ষা, প্রত্যাখ্যান ও জীবনের স্বাভাবিক ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিক শক্তি জোগাতে হবে, যেন তারা প্রতিকূলতায় বেপরোয়া বা উগ্র না হয়ে ওঠে।
২. “কংক্রিটের খাঁচা” ভাঙা ও সামাজিক ভারসাম্য সৃষ্টি: নগর পরিকল্পনায় শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠ, উন্মুক্ত পার্ক ও পাবলিক পাঠাগার রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কিশোরদের ভেতরে জমে থাকা শারীরিক ও মানসিক শক্তি (Pent-up energy) যেন গলির মোড়ের আড্ডা বা মাদকে না গিয়ে খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয়—তার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সাথে পাঠ্যক্রমে “মিডিয়া লিটারেসি” যুক্ত করে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রদর্শনপ্রিয়তা ও “আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ” থেকে তাদের মুক্ত করতে হবে।
৩. “ধ্বংসের ত্রিভুজ” ভাঙা: জুয়া, মাদক ও ‘বড় ভাই’ কালচারের বিদায়: অনলাইন জুয়া ও বেটিং অ্যাপগুলোর লেনদেনের পথ (মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্রিপ্টো) কঠোরভাবে ব্লক করতে হবে। সীমান্ত পাহারা ও আইনি তৎপরতা বাড়িয়ে ইয়াবা-আইসের মতো সিন্থেটিক মাদকের জোগান শূন্যে নামাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় কিশোরদের যারা অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, সেই কথিত “বড় ভাই” ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আগে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৪. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল রূপান্তর: “ভোক্তা” থেকে “স্রষ্টা”: জিপিএ-৫ পাওয়ার মেকি দৌড় ও কেবল পরীক্ষানির্ভর পাঠ্যক্রম থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে জাপানের মতো শিষ্টাচার ও চরিত্র গঠন এবং ফিনল্যান্ডের মতো আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায় থেকে তাত্ত্বিক পড়ালেখার বদলে আইটি ল্যাব, প্র্যাকটিক্যাল কোডিং, রোবোটিক্স ও কারিগরি শিক্ষা চালু করতে হবে, যাতে আমাদের কিশোররা বিদেশের তৈরি ডিজিটাল কনটেন্টের অন্ধ ‘ভোক্তা’ না হয়ে নিজেরা প্রযুক্তি নির্মাণের ‘স্রষ্টা’ হতে শেখে। চীন-জাপান-ফিনল্যান্ড এর শিক্ষাব্যবস্থা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে। চীনা রাষ্ট্রনায়ক দেং শিয়াওপিং (Deng Xiaoping) কারিগরি ও প্রযুক্তিশিক্ষার সুবাদে দুর্ভিক্ষপীড়িত চীনকে আজকের বিশ্বসেরা অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তর করেছেন। অন্যদিকে জাপান পরীক্ষার মেকি মূল্যায়নের চেয়ে শৈশবে শিশুর চরিত্র গঠন, শিষ্টাচার ও নৈতিকতা শিক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। পাশাপাশি ফিনল্যান্ড প্রচলিত মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষার যাঁতাকল ভেঙে আনন্দময় অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে মুক্তচিন্তার প্রজন্ম গড়ে তুলছে।
৫. বিচার কাঠামোর আধুনিকায়ন ও “রেস্টোরেটিভ জাস্টিস”: ২০১৩ সালের শিশু আইন কাগজে বন্দী না রেখে প্রতিটি জেলায় কার্যকর “শিশু আদালত” চালু করতে হবে, যেন সাধারণ আদালতের ট্রমা থেকে শিশুদের রক্ষা করা যায়। গাজীপুর ও যশোরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোকে “অপরাধ শিক্ষার কারখানা” হতে না দিয়ে পর্যাপ্ত প্রবেশন কর্মকর্তা, পেশাদার সাইকোলজিস্ট ও সমাজকর্মী নিয়োগ করতে হবে। সেখানে অপরাধীদের শ্রেণিবিভাজন নিশ্চিত করে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের সত্যিকারের পুনর্বাসন সুনিশ্চিত করতে হবে।
আইন-বিচার রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার হাতিয়ার, কিন্তু সমাজের ভিত মজবুত না হলে কোনো আইনই কার্যকর হয় না। আজকের কিশোররাই আগামীর বাংলাদেশ। এই জনমিতিক লভ্যাংশ জুয়া-মাদক-অবক্ষয়ে হারিয়ে গেলে জাতি হবে মেরুদণ্ডহীন। তাই দোষারোপ নয়—পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে চাই আমূল পরিবর্তন। অন্ধ স্নেহের লাগাম টেনে সন্তানকে মূল্যবোধ আর কারিগরি জ্ঞানে গড়ে তুলতে পারলেই এই বিপুল কিশোর শক্তি হয়ে উঠবে জাতির অমূল্য সম্পদ—আর তবেই আমরা স্বপ্ন দেখতে পারব এক সুস্থ, নিরাপদ, বিজ্ঞানমনস্ক আগামীর।
লেখক: মোঃ ইমন হোসেন, শিক্ষানবিশ আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা।
