শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

বিপন্ন বনের সাথে আদিবাসী উদ্ভিদজ্ঞানের সংকট

তানজিদ শুভ্র

তানজিদ শুভ্র

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:১১ PM ৭৯ বার পঠিত
বিপন্ন বনের সাথে আদিবাসী উদ্ভিদজ্ঞানের সংকট

ফাইল ছবি

উদ্ভিদবিজ্ঞানের চোখে যা কেবল একটি প্রজাতি, আদিবাসী সমাজের কাছে তা হতে পারে জীবন বাঁচানোর ওষুধ কিংবা শত বছরের স্মৃতি। নৃ-উদ্ভিদবিজ্ঞান বা এথনোবোটানি আমাদের শেখায়, গাছ বাঁচানোর লড়াইটি আসলে শেকড় ও সংস্কৃতি বাঁচানোরও লড়াই।

ধরুন, মধুপুরের ঘন শালবনের ভেতরে একটি অচেনা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন মানুষ। একজন আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানী, যাঁর হাতের ফিল্ড নোটবুকে গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম, পাতার গঠন ও বংশ পরিচয় লেখা হচ্ছে। তাঁর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন গারো সম্প্রদায়ের এক প্রবীণ নারী, যিনি হয়তো বৈজ্ঞানিক নামটি জানেন না, কিন্তু তিনি ঠিকই জানেন ঠিক কোন ঋতুতে এই গাছের পাতা সংগ্রহ করলে জ্বরের মহৌষধ তৈরি হয়। তিনি এও জানেন যে, তাঁর দাদি কীভাবে এই গাছের ছায়ায় বসে তাকে গল্প শোনাতেন। দুজনেই একই গাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জ্ঞানজগতের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই যে মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যকার অদেখা অথচ গভীর এক সম্পর্ক, বিজ্ঞান ও লোকজ অভিজ্ঞতার এই সংযোগস্থলটিই হলো এথনোবোটানি বা নৃ-উদ্ভিদবিজ্ঞানের মূল উপজীব্য।

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ টিকে থাকার প্রয়োজনে বনের ওপর নির্ভর করেছে, আর সেই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের সঙ্গে তৈরি হয়েছে তার বিশ্বাস, প্রয়োজন ও সংস্কৃতির এক জটিল বুনন। এথনোবোটানি কেবল ‘কোন গাছে কী রোগ সারে’ তার কোনো সাধারণ তালিকা নয়। এটি উদ্ভিদবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, বাস্তুবিদ্যা এবং নৃ-ঔষধবিজ্ঞানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। একটি নির্দিষ্ট সমাজ কীভাবে একটি উদ্ভিদকে চেনে, তার নামকরণ করে, কোন পদ্ধতিতে তার ঔষধি বা ব্যবহারিক গুণাগুণ কাজে লাগায় এবং সেই জ্ঞান কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হস্তান্তরিত হয় এই শাস্ত্রটি মূলত সেই জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই লোকজ জ্ঞানভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও বর্তমানে তা বেশ হুমকির মুখে। ২০১৪ সালে ‘Journal of Ethnopharmacology’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মধুপুর বনাঞ্চলের স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় অন্তত ৭৮টি উদ্ভিদ প্রজাতির ব্যবহার রয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের এক মাঠগবেষণায় দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মাঝে ১০৫টি উদ্ভিদ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়, যা তারা ৬৭ ধরনের শারীরিক সমস্যা নিরাময়ে ব্যবহার করে আসছেন। দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার চিত্রও অভিন্ন। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানকার মুণ্ডা সম্প্রদায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ৯৮টি ঔষধি উদ্ভিদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যার মধ্যে ১৭টিই হলো প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে অন্তত ৯৪টি ঔষধি উদ্ভিদের ব্যবহারের তথ্য নথিভুক্ত করেছেন গবেষকরা।

তবে এই অমূল্য জ্ঞান কোনো বইয়ের পাতায় ছাপা অক্ষর নয়; এটি বেঁচে থাকে মানুষের দৈনন্দিন চর্চায় ও সামাজিক অভিজ্ঞতায়। বন উজাড় বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন একটি উদ্ভিদ প্রজাতি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যায়, তখন কেবল একটি জৈবিক সত্তারই মৃত্যু ঘটে না। সেই গাছটির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় তার স্থানীয় নাম, সংগ্রহের বিশেষ পদ্ধতি এবং সেই জ্ঞান ধারণ করা মানুষগুলোর স্মৃতি। জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য বিষয়ক প্যানেল আইপিবিইএস এবং ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও উল্লেখ করেছে যে, পরিবেশের সঙ্গে জীবনযাত্রার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়েই মানুষের স্থানীয় জ্ঞান ও ভাষা মারাত্মক সংকটে পড়েছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদজ্ঞান মানেই তা আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্য—এমনটা ভেবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। লোকজ ব্যবহার আমাদের গবেষণার সূত্র বা দিকনির্দেশনা দিতে পারে, কিন্তু তা সত্যিই কোনো রোগের কার্যকর নিরাময় কি না, তা পরীক্ষাগারে যাচাই করার দায়িত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের। কোনো উদ্ভিদকে নিশ্চিত ওষুধ হিসেবে প্রচার করা যেমন বিপজ্জনক, ঠিক তেমনি শত শত বছরের পর্যবেক্ষণের ফসল এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে কেবল ‘কুসংস্কার’ বলে খারিজ করে দেওয়াটাও চূড়ান্ত বোকামি।

বর্তমান বিশ্বে এই জ্ঞান নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গাটি হলো ন্যায্যতা ও অধিকার। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্যবাহী উদ্ভিদজ্ঞান ব্যবহার করে বড় বড় কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছে, অথচ মূল জ্ঞানধারীরা কোনো স্বীকৃতি বা আর্থিক সুফল পাচ্ছেন না। এই ‘বায়োপাইরেসি’ বা জৈব-জ্ঞান দখল রোধ করতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘Convention on Biological Diversity’ এবং ‘Nagoya Protocol’-এর মতো নীতিমালার অধীনে ন্যায্য সুফল বণ্টনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থাও এখন ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

শুধুমাত্র গবেষণাপত্রে কয়েকটি উদ্ভিদের নাম লিখে রাখলেই কি এই বিপুল জ্ঞান সংরক্ষিত হয়ে যাবে? উত্তর হলো—না। জ্ঞান তখনই জীবন্ত থাকে, যখন তার চর্চা হয়, যখন তরুণ প্রজন্ম বনের পথে হেঁটে প্রবীণদের কাছ থেকে প্রকৃতিকে পাঠ করতে শেখে। একটি বন যখন ধ্বংস হয়, তখন আসলে প্রকৃতি ও মানুষের যৌথভাবে লেখা একটি বিশাল ইতিহাসের বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়। তাই গাছ সংরক্ষণের লড়াইটি শেষ পর্যন্ত শুধু কয়েকটি প্রজাতি বাঁচানোর লড়াই নয়। এটি মূলত উদ্ভিদকে ঘিরে গড়ে ওঠা আমাদের পরিবেশ, মানবজীবন ও পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া অমূল্য প্রজ্ঞাকে বাঁচিয়ে রাখার এক মহৎ ও অপরিহার্য সংগ্রাম।

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!