শিশুদের জন্য লেখা বই পড়তে গিয়ে আমার বরাবরই একটা বিষয় মনে হয়, শিশুদের বোঝাতে যাওয়ার চেয়ে তাদের সঙ্গে একটু হাঁটা বেশি জরুরি। কারণ শিশুর পৃথিবী উপদেশে তৈরি হয় না, তৈরি হয় মাঠ, ঘুড়ি, মেলা, মায়ের ডাক, বাবার হাত, নদীর জল আর অকারণ কিছু স্বপ্ন দিয়ে। সেই জায়গা থেকে সোহেল বীরের খোকন তুমি মানুষ হবে পড়তে বসলে মনে হয়, লেখক শিশুকে শেখানোর পাশাপাশি তার পাশে হাঁটতে চেয়েছেন।
বইটি মূলত ছড়া ও কবিতার সংকলন। প্রকাশকাল অমর একুশে বইমেলা ২০২২। প্রকাশক শিশু গ্রন্থকুটির। প্রচ্ছদ করেছেন মামুন হোসাইন, আর অলংকরণ করেছেন নয়ন কুমার অধিকারী। বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছবির সঙ্গে কবিতার যে সহাবস্থান, তা শিশু পাঠের আনন্দকে বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দেয়।
বইটির নাম খোকন তুমি মানুষ হবে। নামটির মধ্যেই যেন বইটির একটা বড় অংশ লুকিয়ে আছে। তবে বইটি শুধু ‘মানুষ হওয়ার’ নীতিকথা বলে যায় না। বরং খোকনের চোখ দিয়ে দেখা নানা ছোট-বড় অনুভূতির মধ্য দিয়ে শৈশবের একটি চেনা পৃথিবী নির্মাণ করে।
প্রথম কবিতাতেই খোকনের দস্যিপনা, পড়াশোনার প্রতি অনীহা, ঘুড়ির পেছনে ছুটে চলা আর মায়ের শাসনের সঙ্গে তার সম্পর্ক পাওয়া যায়। শেষে পড়াশোনার গুরুত্বের কথা আসে। কিন্তু এর পরের কবিতাগুলো বইটিকে কেবল নীতিশিক্ষার জায়গায় আটকে রাখে না। বরং মা, বাবা, বন্ধু, গ্রাম, নদী, মাঠ, মেলা, ঋতু, স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, নজরুল এবং বই পড়ার মতো নানা প্রসঙ্গ একে একে যুক্ত হয়।
আমার কাছে বইটির সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা এর শৈশবের গন্ধ। ‘অতীত ফ্রেমে’, ‘মায়ের দেখা’, ‘ঘুড়ি’, ‘বৈশাখী মেলা’, ‘খুঁজে ফিরি ছেলেবেলা’ কিংবা ‘আমাদের গাঁ’-এর মতো কবিতায় যে পৃথিবী উঠে আসে, সেটি খুব জাঁকজমকপূর্ণ কোনো কল্পলোক নয়। বরং আমাদের পরিচিত বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট, নদী, কাশফুল, জোনাক, মেলা আর গ্রামের মানুষের পৃথিবী। ‘অতীত ফ্রেমে’ কবিতায় কুমার নদ, জোনাকি, কাশফুল ও গ্রামীণ সুরের যে স্মৃতিময় আবহ, সেটি বইটির অন্যতম সুন্দর অনুভব।
‘মায়ের দেখা’ কবিতায় শহরের ইট-পাথরের ভিড়ে থেকেও গ্রামের সবুজের মধ্যে মাকে খুঁজে পাওয়ার যে অনুভূতি, সেটি শিশুতোষ কবিতার পরিচিত সরলতার মধ্যেও আলাদা আবেগ তৈরি করে। আবার ‘বাবা’ কবিতায় বাবাকে দেখা হয়েছে আশ্রয় ও ভালোবাসার জায়গা হিসেবে। এই মা-বাবার উপস্থিতি বইটিকে শিশুর ঘরের খুব কাছে নিয়ে আসে।
প্রকৃতির সঙ্গে শিশুমনের সম্পর্কটিও বইটির বড় সম্পদ। ‘মেঘের মতো উড়তে’ কবিতায় মেঘকে দেখে দূরে কোথাও চলে যাওয়ার ইচ্ছা, ‘ঘুড়ি’তে আকাশের সঙ্গে শিশুর টান, আর ‘অপরূপ এই শরতে’ শরতের নানা চিত্র একসঙ্গে মিলে এমন একটি আবহ তৈরি করে, যেখানে প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়, শিশুর কল্পনারও অংশ।
এই বইয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর গ্রামীণ জীবনচিত্র। ‘আমাদের গাঁ’ কবিতায় নদী, নৌকা, জেলে, মাঠ, মেলা, বন্ধুত্ব, পাখি ও পোকামাকড় মিলিয়ে একটি জীবন্ত গ্রাম উঠে আসে। ‘অঘ্রাণে ভরা ক্ষেত’ কবিতায় ধান কাটা, কৃষকের পরিশ্রম ও নতুন ফসলের আনন্দের মধ্য দিয়ে কৃষিজীবনের সঙ্গে শিশুমনের পরিচয় ঘটে।
দেশ ও ইতিহাসের প্রসঙ্গও লেখক এড়িয়ে যাননি। ‘রক্ত দিয়ে দেশ পেয়েছি’ এবং ‘শাবাশ বাংলাদেশ’-এর মতো কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কথা এসেছে। এখানে দেশপ্রেম শিশুর কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে। বিশেষ করে ‘বিজয়’কে শুধু একটি ঐতিহাসিক দিনের মধ্যে না রেখে ফুল, কৃষক, রাখাল, জোনাকি, স্বাধীনভাবে চলার অধিকার এবং লাল-সবুজের দেশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়াসটি ভালো লেগেছে।
ভাষার দিক থেকে সোহেল বীর খুব বেশি দুরূহ পথে হাঁটেননি। সহজ শব্দ, ছোট বাক্য, ছন্দ এবং পরিচিত উপমা ব্যবহার করেছেন। ফলে শিশুদের উচ্চস্বরে পড়ার জন্য কবিতাগুলো বেশ স্বাভাবিক। অলংকরণও সেই সরলতার সঙ্গে মানানসই। রঙিন জলরঙের মতো ছবিগুলো কবিতার দৃশ্যগুলোকে চোখের সামনে এনে দেয়।
তবে সব কবিতা সমান শক্তিশালী নয়। কিছু জায়গায় বক্তব্য একটু বেশি সরাসরি হয়ে গেছে। বিশেষ করে নৈতিক শিক্ষা বা দেশপ্রেমের কথা বলতে গিয়ে কোথাও কোথাও কবিতার নিজস্ব সৌন্দর্যের চেয়ে বক্তব্য সামনে চলে এসেছে। আরও কিছু কবিতায় চিত্রকল্প ও শব্দের নতুনত্ব থাকলে বইটির সাহিত্যিক বৈচিত্র্য বাড়ত। তবে শিশুতোষ বইয়ের পাঠযোগ্যতার বিচারে এই সরলতাই আবার বড় সুবিধা। লেখক কঠিন করে শিশুর কাছে পৌঁছাতে চাননি।
বইটির বয়সসীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই। তবে ভাষা, ছন্দ, বিষয় ও অলংকরণ বিবেচনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য বইটি বিশেষভাবে উপযোগী মনে হয়। বড়দের জন্যও এর আলাদা একটি পাঠ আছে, বিশেষ করে যারা গ্রামের শৈশব পেছনে ফেলে শহুরে জীবনে এসেছেন। ‘খুঁজে ফিরি ছেলেবেলা’ কিংবা ‘মন হারিয়ে যায়’-এর মতো কবিতা তাদের নিজের ফেলে আসা সময়ের দরজায়ও কড়া নাড়তে পারে।
সবশেষে, খোকন তুমি মানুষ হবে আমার কাছে এমন একটি বই, যার বড় শক্তি তার সরলতায়। এটি খুব বড় কোনো সাহিত্যিক ঘোষণা দিতে চায় না। বরং শিশুর হাতে কয়েকটি পরিচিত দৃশ্য তুলে দেয়, আর সেই দৃশ্যগুলোর ভেতর দিয়ে ভালোবাসা, প্রকৃতি, পরিবার, দেশ ও স্বপ্নের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সোহেল বীরের লেখক-পরিচয়েও শিশুতোষ সাহিত্য ও ছড়াকবিতার প্রতি তাঁর দীর্ঘ আগ্রহের উল্লেখ রয়েছে।
বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়, শৈশব আসলে খুব দূরের কোনো সময় নয়। একটি ঘুড়ি, মায়ের ডাক, শরতের কাশফুল কিংবা গ্রামের পথ হঠাৎ তাকে আবার কাছে নিয়ে আসতে পারে। খোকন তুমি মানুষ হবে সেই ফিরে আসার পথটুকুই বেশ আন্তরিকভাবে খুলে দেয়।
