নারী! নারীর অগ্রযাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সাথে বাড়ছে অর্জনের ঝুলিও। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার চক্রে জীবনযাপন করছে সিংহভাগ নারী। প্রতিদিনের ব্যস্ততা থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া পর্যন্ত, নিরাপত্তাহীনতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীর অগ্রগতির পথে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা মেলে নারী নিরাপত্তাহীনতার করুণ সমীকরণ। প্রতিবাদ করলেও মেলে না পর্যাপ্ত সুফল। নারী নিরাপত্তাহীনতার ঘটনাগুলো অন্য ঘটনার নিচে ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে অনেকাংশে প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নারীর নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়বদ্ধতা।
আধুনিকায়নের অন্তর্জালে দেশ ধাবিত হচ্ছে সংস্কার ও পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাঠামো অনুসরণে। কিন্তু এই উন্নতির পেছনে গভীর সংকট তৈরি করছে নারী নিরাপত্তা। নিরাপত্তাহীনতার চাদরে যখন চারপাশ ঢেকে গেছে, তখন অসংখ্য নারী মানবেতর জীবনযাপন করছে সমাজ তথা দেশে। এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ দেখছে একের পর এক নারী নির্যাতনসহ অনেক রক্তাক্ত ঘটনার চিত্র। নারী মানবসমাজের প্রাণশক্তি। একটি ভয়হীন ও সুরক্ষিত পরিবেশেই নারী তার মেধা, মনন ও প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন। নিরাপদ সমাজ পেলে নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে পারেন, যা একটি শক্তিশালী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে অধিকাংশ নারী। বাড়ি থেকে বের হতে না হতেই পুরুষরূপী হিংস্র জানোয়ারের কিংবা হায়েনাদের লোভাতুর, আক্রমণাত্মক বা হিংস্র দৃষ্টি গ্রাস করছে। নারীরা প্রতিনিয়ত কটূক্তি ও নানা নোংরা কুপ্রস্তাবের শিকার হচ্ছেন। কখনো কখনো নিজের স্বামী, মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, আবার কখনো নিজের সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব বা সহপাঠী দ্বারা। অশালীন মন্তব্য, শরীর স্পর্শ, শিস দেওয়া, যৌতুক, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, ভয়াবহ নিপীড়ন, ধর্ষণ, পিছু নেওয়া, রাগের ক্ষোভে শরীর দ্বিখণ্ডিত করে ফেলা, হায়েনাদের ভোগের পণ্য হওয়া, এই যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরা যেসব জায়গায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন তা নিরূপণ করা হলো:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী নিরাপত্তাহীনতা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নারীদের সুরক্ষিত স্থান হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। র্যাগিং থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, বুলিংয়ের বেশি শিকার হন মেয়েরা। অনেকাংশে দেখা মেলে শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার নারী শিক্ষার্থী। শিক্ষকের কুপ্রস্তাবে অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি থাকলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে উঠছে নানান প্রশ্ন। ভয়ে বা লজ্জায় অভিযোগ না করার সংস্কৃতি এখনও আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে গেঁথে আছে। সন্ধ্যার পর লাইব্রেরি, ল্যাব বা আবাসিক হলে ফেরার পথটা অনেক মেয়ের কাছেই বর্তমানে আতঙ্কের বিষয়। নিরাপদ ক্যাম্পাস মানে শুধু সিসিটিভি, সিকিউরিটি গার্ড কিংবা প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, নিরাপদ ক্যাম্পাস মানে দ্রুত বিচার আর ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করা।
রাস্তাঘাটে নারী নিরাপত্তাহীনতা
গণপরিবহন নারীর জন্য প্রতিদিনের যুদ্ধযান। ছুটতে হয় ক্যারিয়ার কিংবা কর্মক্ষেত্রে। কত যে খারাপ স্পর্শের শিকার হতে হয় গণপরিবহনে, তা বলা মুশকিল। নারীদের নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। গণপরিবহনে নিরাপত্তাহীনতা নারীদের কর্মজীবনে অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই বড় শহরগুলোতে নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা, গণপরিবহনে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সিসিটিভি ও নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। গণপরিবহনে এই যে ভিড়ের সুযোগে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, বাজে মন্তব্য, ফলো করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সন্ধ্যার পর রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেলে ভয় আরও বাড়ে। পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট নেই, পুলিশের টহল অনিয়মিত, আর অভিযোগ করলে উল্টো প্রশ্ন আসে “এত রাতে বাইরে কেন?”। ফলে অনেক নারী পড়াশোনা বা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন শুধু যাতায়াত নিরাপদ নয় বলে। একটি শহর তখনই আধুনিক যখন সেখানে একজন নারী রাত ১০টায়ও নির্ভয়ে হাঁটতে পারেন।
কর্মক্ষেত্রে নারী নিরাপত্তাহীনতা
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং টেকসই সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নারীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসাবাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং, গার্মেন্টসসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নারীশ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো নানাবিধ বৈষম্য, নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। তাই নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই হবে না, বরং একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। নারীদের শিক্ষার অভাবও তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। আমাদের দেশের শ্রমজীবী নারীদের একটি বড় অংশ স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত। ফলে তারা দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও কম মজুরির কাজে নিয়োজিত থাকতে বাধ্য হন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন হতে পারেন না। ফলে সহজেই তারা শোষণের শিকার হন। আধুনিক বিশ্বে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ছাড়া ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া কঠিন। তাই নারীদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের বড় অংশজুড়ে রয়েছেন নারীশ্রমিকরা। দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু এখানেও নারীশ্রমিকদের জীবন খুব সহজ নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, স্বাস্থ্যঝুঁকি, মাতৃত্বকালীন সুবিধার অপ্রতুলতা এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়। অনেক সময় তারা অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য হন কিন্তু সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে তারা বাধ্য হয়েই এসব অন্যায় মেনে নেন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা। আমাদের সমাজ এখনো অনেকাংশে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় পরিচালিত। অনেকেই মনে করেন, নারীর প্রধান কাজ শুধুই সংসার সামলানো। ফলে অনেক নারী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরিবারের চাপে কর্মজীবন থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। আবার কর্মজীবী নারীদের সংসারের সব দায়িত্বও পালন করতে হয়। অফিসে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর ঘরে ফিরেও রান্না, সন্তান লালন-পালন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দেখাশোনা করতে হয়। কিন্তু এই গৃহস্থালি শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন করা হয় না। অথচ এটি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই নারীদের ঘরের কাজকেও শ্রম হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন কার্যকর আইন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন। যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নারীরা যেন ভয়ের পরিবেশে নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারেন, সে পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে হলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের শিক্ষা, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়িত করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই নারীরা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবেন। তখনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
লেখক: তারানুর হক শিফা, প্রেসিডেন্ট, সেইভ আওয়ার উইমেন বাংলাদেশ
