দৃশ্যমান জখম সবার চোখে পড়ে, কিন্তু মনের গভীর ক্ষত বা অদৃশ্য চাপগুলো থেকে যায় আড়ালেই। আধুনিক জীবনের দ্রুতগতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোঝলকানি আর সীমাহীন দুশ্চিন্তার মাঝে মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানসিক সুস্থতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মনের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাই একটি সুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ার প্রথম শর্ত। ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ উপলক্ষে মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছেন ইডেন মহিলা কলেজের একদল শিক্ষার্থী। মতামতগুলো গ্রন্থনা করেছেন একই কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাম্মী শফিক জুঁই।
আমি ভালো নেই বলতে আর দ্বিধা কেন?
আমরা আমাদের নিজেদের নিয়ে কতটাই বা ভাবি? কতটা নিজের ইচ্ছেমতো সবকিছু করতে পারি? সব সময় ভালো থাকার অভিনয় করতে করতে কখন যে নিজের মনের কষ্টগুলোকে চাপা দিয়ে দিই, তা আমরা নিজেরাও জানি না। হাসিমুখের এক মুখোশের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলি নিজের অজান্তেই। আমরা ভাবি, আমাদের দুর্বলতা বা অনুভূতি সবটা প্রকাশ করলে কেউ হয়তো আমাদের তুচ্ছ বা দুর্বল ভাববে। অথচ ভালো না থাকাটা কোনো অপরাধ নয়, কষ্ট পাওয়াটা কোনো দুর্বলতা নয়। হাসি, কষ্ট, দুঃখ সবকিছুর অনুভূতি মিলেই মানুষ। মনের অবস্থার কথা স্পষ্ট জানান দেওয়া আমাদের অধিকার। নিজেদের অনুভূতির কথা ও মানসিক বিষণ্নতার কারণ জানিয়ে দিন। নিজেদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। পাশাপাশি নিজের গুরুত্ব বোঝা এবং স্বাভাবিক পরিবেশে বাঁচতে সাহায্য করবে এমন পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমি ভালো নেই, এই কথা বলতে আর কোনো দ্বিধা নয়। মানুষ হিসেবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বেঁচে থাকাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তবেই না আমরা নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে পারব।
– আফরিদা ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব সংকট ও উত্তরণের পথ
একজন তরুণকে বাইরে থেকে হাসিখুশি দেখালেই কি ধরে নেওয়া যায়, সে ভালো আছে? হয়তো মনের ভেতরে জমে আছে দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা কিংবা একাকিত্ব। পড়াশোনার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, পরিবারের প্রত্যাশা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা তরুণদের মানসিক চাপে ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাতজনের একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। এই সংকট মোকাবিলায় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সহানুভূতিশীল হতে হবে। তরুণদের অনুভূতি ও সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং সেবা চালু এবং বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও শরীরচর্চা মানসিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে। এমন সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তরুণেরা নির্ভয়ে নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারবেন এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা পাবেন। কারণ, সুস্থ মন নিয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ প্রতিটি তরুণের প্রাপ্য।
– মাগফেরা আখতার, সমাজকর্ম বিভাগ।
মনের যত্ন: সচেতনতা থেকে দৈনন্দিন অভ্যাস
সুস্থ জীবন মানে শুধু শরীরের যত্ন নয়, মনের প্রতিও সমান যত্নশীল হওয়া। নিজের জন্য সময় রাখা কঠিন হলেও মানসিক সুস্থতার জন্য তা জরুরি। নিজের অনুভূতি বোঝার মাধ্যমেই মনের যত্ন শুরু হয়। আনন্দ, বিরক্তি, দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব বা ক্লান্তির কারণ বোঝার চেষ্টা করলে নিজের প্রয়োজন স্পষ্ট হয়। মনের যত্নে বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে হাঁটা, গান শোনা, ডায়েরি লেখা, বই পড়া ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলা আত্মসচেতনতা বাড়াতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার ও নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা মানসিক সুস্থতার সহায়ক। কাজের মাঝে বিরতি ও বিনোদনের সময় রাখলে ক্লান্তি কমে এবং ভারসাম্য বজায় থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংযম রাখুন। পরিবার, বন্ধু বা প্রিয়জনের সঙ্গে অনুভূতি প্রকাশ করুন, এতে মানসিক শক্তি বাড়ে। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ কমে গেলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলুন। এটি দুর্বলতা নয়, দায়িত্বশীলতার পরিচয়। সুস্থ থাকার জন্য বড় পরিবর্তনের অপেক্ষা করতে হয় না। নিজের প্রতি একটু মনোযোগ থেকেই পরিবর্তন শুরু হতে পারে। মনের যত্ন হলো নিজের প্রয়োজন বুঝে নিজেকে ভালো রাখার সচেতন জীবনচর্চা।
– জুহা, সমাজকর্ম বিভাগ।
মানসিক স্বাস্থ্যে খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও হরমোনের ভূমিকা
মানসিক সুস্থতা মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সুস্থতা বজায় রাখতে খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও হরমোনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মাছ, বাদাম, শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার মানসিক সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের পারস্পরিক যোগাযোগও মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। পাশাপাশি সেরোটোনিন মেজাজ নিয়ন্ত্রণে এবং মেলাটোনিন ঘুমের চক্র বজায় রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন সাধারণত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের অভাব মানসিক চাপ, বিরক্তি ও বিষণ্ণতার লক্ষণ বাড়াতে পারে। তাই মানসিক সুস্থতার জন্য সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম জরুরি। নিয়মিত সময়ে ঘুমানো এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলাও উপকারী। সচেতন অভ্যাস মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে।
– নাজিয়া তাবাসসুম, সমাজকর্ম বিভাগ।
সুস্থ মন ও সফল জীবন: আত্মউন্নয়নের নেপথ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের ভূমিকা
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় জয়টি সব সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে অর্জিত হয় না, কখনো তা অর্জিত হয় নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে সামলে আবার নতুন করে শুরু করার মধ্য দিয়ে। অথচ সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, আমাদের মনেরও বিশ্রাম প্রয়োজন, অনুভূতিরও যত্ন প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক সুস্থতা মানুষকে জীবনের চাপ মোকাবিলা, নিজের সক্ষমতা বিকাশ এবং দৈনন্দিন কাজে কার্যকর থাকতে সহায়তা করে। ব্যর্থতার ভয়, অন্যের সঙ্গে তুলনা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এসবের ভিড়ে মানুষ কখনো কখনো নিজের সামর্থ্যকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করে। তাই আত্মউন্নয়ন মানে শুধু নিজেকে আরও যোগ্য করে তোলা নয়, নিজের দুর্বলতা বুঝতে শেখা, প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের প্রতি সদয় থাকা। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুস্থ সম্পর্ক ও প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা মানসিক সুস্থতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জীবনে কতটা উঁচুতে উঠলাম সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সেই পথে চলতে গিয়ে নিজেকে কতটা হারালাম আর কতটা আগলে রাখতে পারলাম।
– মায়মুনা, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ।
