তানজিলা আক্তার তানু:
আজ শিক্ষক দিবসের এই বিশেষ মুহূর্তে স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে আমার প্রথম হাতেখড়ির শিক্ষক সুমি আক্তারের স্নিগ্ধ, হাস্যোজ্জ্বল মুখটি। তাঁর কাছে পড়তে যাওয়া, প্রথম দিনের সম্ভাষণ এবং পরম মমতায় জ্ঞানার্জনের দীর্ঘ পথটিকে আমার জন্য সহজ করে তোলা, সবই আজ গভীরভাবে মনে পড়ছে। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন আমার পথপ্রদর্শক, মানসিক অভিভাবক ও এক অনন্য আস্থার জায়গা।
বলা হয়ে থাকে, শিক্ষার প্রথম ধাপ শুরু হয় পরিবারে। তবে মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও স্বপ্নের বীজ বোনার কাজটি ঘটে শিক্ষকের হাত ধরেই। আমার জীবনে সেই মহান কারিগর হয়ে এসেছিলেন সুমি ম্যাডাম। প্রথম যেদিন তাঁর কাছে পড়তে বসেছিলাম, ভেতরে ছিল এক অজানা ভয় ও দ্বিধা। কিন্তু ম্যাডামের স্নিগ্ধ হাসি আর সাবলীল কথায় মুহূর্তেই সেই ভয় উধাও হয়ে যায়। তাঁর পড়ানোর শৈলী ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ করানো বা সিলেবাস শেষ করার মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন না। যেকোনো কঠিন বিষয়কে গল্পের মতো সাজিয়ে এমনভাবে তুলে ধরতেন, যেন পড়ালেখা কখনোই বোঝা মনে হতো না।
ম্যাডামের যে গুণটি আমাকে চিরকাল মুগ্ধ করেছে, তা হলো তাঁর সীমাহীন ধৈর্য। কোনো পড়া বারবার না বুঝলেও তিনি কখনো বিরক্ত হননি; হাসিমুখে নতুন উদাহরণ দিয়ে বোঝাতেন। তাঁর এই ধৈর্যশীলতার শিক্ষা আজ আমার ব্যক্তিগত জীবনেও যেকোনো প্রতিকূলতা মোকাবিলায় অনুপ্রেরণা জোগায়। শুধু তা-ই নয়, যখনই কোনো কারণে মন খারাপ করে থাকতাম বা দ্বিধায় ভুগতাম, ম্যাডাম ঠিকই তা বুঝে যেতেন। একজন মায়ের মমতা আর বন্ধুর সহমর্মিতা নিয়ে তিনি পাশে দাঁড়াতেন। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলার দিনগুলোতে তাঁর একটি বাক্য, ‘তুমি পারবে, তোমার মধ্যে সেই যোগ্যতা আছে’, আমার ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তুলত।
আজকের এই বিশেষ দিনে ছোটবেলার অনেক স্মৃতিই মনে পড়ছে। আমি যখন পড়তে চাইতাম না, বায়না ধরতাম, তখন ম্যাডামের মা (আমার প্রিয় নানি) আদর করে ভাত খাইয়ে দিতেন। আর সুমি ম্যাডাম আমাকে কোলে করে দোকানে নিয়ে খাবার কিনে দিয়ে বলতেন, ‘এবার পড়ো।’ এত বায়না সত্ত্বেও তিনি কখনো আমার ওপর বিরক্ত হননি। ম্যাডামের ছোট বোন শিউলি আন্টিও আমাকে পড়িয়েছেন। পড়া শেষে দুই বোন মিলে আমাকে সাজিয়ে দিতেন, হাতে মেহেদি পরিয়ে দিতেন। সেই দিনগুলোর কথা আজও খুব মনে পড়ে।
সুমি ম্যাডাম শুধু পুঁথিগত বিদ্যাই দেননি, আমাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পাঠ দিয়েছেন। তিনি সব সময় বলতেন, ‘বড় ডিগ্রি অর্জনের চেয়ে আগে একজন ভালো মানুষ হওয়া বেশি জরুরি।’ তাঁর এই কথাটি আমার জীবনের মূলমন্ত্র। স্বার্থহীন ভালোবাসায় নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করার এই মহৎ ব্রত সত্যিই বন্দনীয়। শিক্ষক দিবসে আমার প্রিয় সুমি ম্যাডামসহ পৃথিবীর সব শিক্ষকের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সরকারি আদমজীনগর এম ডব্লিউ কলেজ, নারায়ণগঞ্জ
