তানজিলা আক্তার তানু:
শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত। শিক্ষকেরা কোনো প্রতিদানের আশায় আলো ছড়ান না। তাঁদের একমাত্র চাওয়া থাকে, শিক্ষার্থীরা যেন সত্যিকারের মানুষ হয়ে সমাজ ও দেশের কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকারী কোনো ব্যক্তি নন; তিনি একজন সমাজসংস্কারক, পথপ্রদর্শক এবং মূল্যবোধের কাণ্ডারি। প্রখ্যাত দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, শিক্ষাই হলো আত্মার সেই রূপান্তর, যা মানুষকে অন্ধকারের আলোক অভিমুখে নিয়ে যায়। আর এই রূপান্তরের কারিগর হলেন শিক্ষক।
একটি শিশু যখন প্রথম বিদ্যালয়ে পা রাখে, তখন সে থাকে একখণ্ড কাদার মতো। শিক্ষকেরাই ভালোবাসার স্পর্শে, শাসনের মাধ্যমে এবং জ্ঞানের আলো দিয়ে সেই কাদামাটিকে সুন্দর মূর্তিতে রূপ দেন। অন্ধকার ঘরে একটি মোমবাতি যেমন নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যকে আলো দেয়, শিক্ষকও ঠিক তেমনি নিজে ক্ষয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীর জীবনকে আলোকিত করেন।
শিক্ষক দিবসে আমরা হয়তো প্রিয় শিক্ষককে ফুল দিই, শ্রদ্ধা জানাই কিংবা স্মৃতিচারণ করি। কিন্তু এই এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা কি সত্যিই তাঁদের প্রাপ্য সম্মানের পুরোটা মেটাতে পারে? বাস্তবতা হলো, শিক্ষক দিবসের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের পর বছরের বাকি ৩৬৪ দিন আমরা শিক্ষকদের ভুলে থাকি। বর্তমান সমাজে শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়িত। বিশেষ করে শিক্ষকদের যে আত্মত্যাগ, তার তুলনায় তাঁদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় ততটা শ্রদ্ধাপূর্ণ থাকে না।
বছরের অন্যান্য দিনে আমরা যদি শিক্ষকের শেখানো উপদেশ ভুলে যাই, রাস্তাঘাটে দেখা হলে না দেখার ভান করে চলে যাই কিংবা তাঁদের অসম্মান করি, তবে এক দিনের শিক্ষক দিবস পালনের কোনো সার্থকতা থাকে না। ভালোবাসাকে এক দিনের ফ্রেমে বন্দী না করে, প্রতিদিনের আচরণে প্রকাশ করাই হলো আসল কথা। শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বড় কোনো আয়োজন বা দামি উপহারের প্রয়োজন হয় না। দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট আচরণের মাধ্যমেই তাঁদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব।
একজন শিক্ষকের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো তাঁর শিক্ষার্থীর সাফল্য ও চরিত্র গঠন। তিনি যা শিক্ষা দিয়েছেন, যেমন সততা, অধ্যবসায় ও সঠিক মূল্যবোধ, তা যদি একজন শিক্ষার্থী সারা জীবন মেনে চলে, তবে সেটাই হয় শিক্ষকের প্রতি প্রতিদিনের সেরা উপহার। শিক্ষকদের প্রতি ভালোবাসা কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বার্থেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মান দিতে হলে তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন শিক্ষক কখনোই তাঁর সেরাটা দিতে পারেন না। রাষ্ট্র যখন শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করবে, সমাজ যখন তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করবে এবং শিক্ষার্থীরা যখন প্রতিদিন তাঁদের হৃদয়ে ধারণ করবে, তখনই সত্যিকার অর্থে শিক্ষকের প্রতি সুবিচার করা হবে।
তাই শিক্ষক দিবস নিশ্চয়ই উদ্যাপিত হবে একটি বিশেষ স্মারক দিন হিসেবে, কিন্তু সেই ভালোবাসার রেশ যেন থমকে না যায় সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে। বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের হৃদয়ে জেগে থাকুক শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অনুভূতি। শিক্ষকের শেখানো জ্ঞানের মশাল ধরে রেখে নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রতিদিনের শিক্ষক দিবস।
