খবরের পাতা খুললেই প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে নারী নিরাপত্তাহীনতার করুণ চিত্র। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং দায়বদ্ধতার অভাবেই মূলত নারীরা পদে পদে এই নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। অনেক সময় প্রতিবাদ করলেও পর্যাপ্ত সুফল মেলে না, বরং দীর্ঘসূত্রতা বা নীরবতায় ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। এমন বাস্তবতায় নারীদের অবস্থান, প্রতিবাদের ধরন এবং প্রশাসনের করণীয় নিয়ে নিজেদের সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন কয়েকজন তরুণী। তাঁদের এই ভাবনাগুলো সংকলন করেছেন ‘সেইভ আওয়ার উইমেন বাংলাদেশ’-এর চট্টগ্রাম ডিভিশন মিডিয়া উইংয়ের সদস্য মুহিবুল হাসান রাফি।
হেনস্তার নেপথ্যে সমাজের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি
নারীরা হেনস্তার শিকার হন মূলত সমাজের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও সচেতনতার অভাবের কারণে। অনেকেই নারীকে দুর্বল বা অধীন হিসেবে দেখেন, যা তাদের ওপর নির্যাতন বা অসম্মানজনক আচরণকে প্রশ্রয় দেয়। রাস্তাঘাট, কর্মস্থল—এমনকি নিজের ঘরেও নারীরা অনেক সময় নিরাপদ থাকেন না। হেনস্তার পেছনে আরও রয়েছে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অপরাধীর অপরাধকে তুচ্ছভাবে নেওয়া। সমাজ প্রায়শই নারীর পোশাক বা আচরণকে দোষারোপ করে, অথচ প্রকৃত সমস্যাটি উপেক্ষিত থেকে যায়। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে চাই সচেতনতা, শিক্ষা, নারীর প্রতি সম্মান এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে, যেন নারীরা নিরাপদ, সম্মানিত ও স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারেন। হেনস্তা রোধের শুরু হোক মানসিকতার পরিবর্তন দিয়ে। মনে রাখতে হবে, নারীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা শুধু একটি অধিকার নয়, বরং একটি সচেতন, সম্মানপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত।
জেরিন আক্তার ইভা
শিক্ষার্থী, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
নারী কার কাছে অধিক নিরাপদ?
বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া তাঁর ‘গৃহ’ প্রবন্ধে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “প্রাণী-জগতে কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয়া নহে। সকলেরই গৃহ বা নিরাপত্তা আছে, নাই কেবল আমাদের।” নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের একুশ শতকের এই আধুনিক যুগেও বারবার প্রশ্ন ওঠে—নারীর নিরাপত্তা কোথায় বা নারী কার কাছে অধিক নিরাপদ? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির দায়িত্ববোধকেই প্রশ্ন করতে হয়। কেননা, বর্তমান সমাজে পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং বিচারহীনতার কারণে নারীর হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা কম নয়। এই সমস্যাগুলোর উত্তরণ ঘটিয়ে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন আমাদের মনমানসিকতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক আচরণের ইতিবাচক প্রতিফলন। তা ছাড়া এই সময়ে এসে নারী আত্মবিশ্বাসী হয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে নিজস্ব নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করতে পারে। সর্বোপরি, একজন নারী সেই পুরুষ এবং সমাজের হাতেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ—যে পুরুষ এবং সমাজ তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল এবং বিশ্বাস করে লিঙ্গ নয়, বরং ব্যক্তি ও যোগ্যতাই সমাজের মূল মাপকাঠি।
লামিয়া ভূঁইয়া তরী
শিক্ষার্থী, সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ
নারীর কণ্ঠ হতে হবে স্পষ্ট ও সাহসী
আমি মনে করি, নারীদের কণ্ঠের দৃঢ়তা মানে কেবল উচ্চস্বরে কথা বলা নয়, বরং নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করা। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে নারীর কণ্ঠ এক জায়গায় আটকে ছিল, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আজ নারীরা নিজের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়ে আরও সচেতন হচ্ছেন। একজন নারীর কণ্ঠ তখনই দৃঢ় হয়, যখন তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পান না, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে আপস করেন না এবং নিজের ও অন্য নারীর অধিকার আদায়ে দীপ্ত কণ্ঠ তুলতে পারেন। দৃঢ় কণ্ঠ সমাজে সচেতনতা তৈরি করে, অনুপ্রেরণা জাগায় এবং ন্যায়ের পক্ষে পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। একজন নারী যদি নিজের পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক পর্যায়ে স্পষ্টভাবে মতপ্রকাশ করার স্বাধীনতা পান, তাহলে তার মাধ্যমে অন্য নারীরাও অনুপ্রাণিত হবেন। নারীর কণ্ঠ কখনো ভাঙা যাবে না, কারণ এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক এবং সমতার পথে অগ্রযাত্রার হাতিয়ার। তাই নারীদের কণ্ঠ হতে হবে স্পষ্ট, সাহসী, যুক্তিনির্ভর এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের অঙ্গীকারে সর্বদা দৃঢ়।
তারানুর হক শিফা
শিক্ষার্থী, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি
অন্যায়ের বিরুদ্ধে চাই সংগঠিত প্রতিবাদ
বাড়ি থেকে বের হতে না হতেই অনেক সময় পুরুষরূপী হিংস্র জানোয়ারদের লোভাতুর বা আক্রমণাত্মক দৃষ্টি গ্রাস করে নারীদের। নারীরা প্রতিনিয়ত কটূক্তি ও নানা নোংরা কুপ্রস্তাবের শিকার হচ্ছেন। কখনও স্বামী, আত্মীয়স্বজন, আবার কখনও সহকর্মী বা সহপাঠী দ্বারা। যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, নিপীড়ন, ধর্ষণ—এই যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হলো সচেতনতা, শিক্ষা ও সংগঠিত প্রতিবাদ। একজন নারী যদি নিজের অধিকার সম্পর্কে জানেন, তবে তিনি অন্যায়কে চিহ্নিত করতে পারবেন এবং সাহসের সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন। পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের আশ্রয় নেওয়াও জরুরি। একক প্রতিবাদ দুর্বল মনে হলেও সংগঠিত প্রতিবাদ সমাজে বড় পরিবর্তন আনে। তবে এর শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই—সন্তানকে ন্যায়বোধ শেখানো, অবহেলাকে ‘না’ বলা এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই পরিবর্তনের সূচনা। নারীর প্রতিবাদ মানে কেবল সড়কে স্লোগান নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান।
সোমাইয়া সোলতানা সুমু
শিক্ষার্থী, সাতকানিয়া সরকারি কলেজ
আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এবং ‘পারিবারিক সহিংসতা আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া হেল্পলাইন নম্বর (৯৯৯) তো আছেই। আইন থাকলেও মিলছে না সুফল। এর পেছনে রয়েছে কিছু কারণ। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে গেলে আইনি জটিলতা পোহাতে হয়, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব হয়। দায়ের করা অভিযোগের সমান গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতাও পরিলক্ষিত হয়। পাশাপাশি মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও তদন্তে দুর্বলতার কারণে নারীরা দ্রুত সুবিচার পান না। প্রশাসনকে আইনের এমন কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী শাস্তি না পাওয়া পর্যন্ত খোলা বাতাসে বুক ফুলিয়ে হাঁটতে না পারে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনকে আরও সচেতন হতে হবে। তবেই নারীদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
সাদিয়া ইসলাম
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ
প্রশাসনের সক্রিয়তাই গড়বে নিরাপদ পরিবেশ
বর্তমান সমাজে নারীর নিরাপত্তা একটি গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র কিংবা গণপরিবহন—প্রায় সর্বাবস্থায় নারীরা হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এ অবস্থায় প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা, প্রতিটি এলাকায় নারীদের জন্য বিশেষ হেল্প ডেস্ক চালু করা, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পদক্ষেপ গ্রহণ, সচেতনতামূলক প্রচারণা বৃদ্ধি এবং গুরুতর অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। নারী নিরাপদ হলে সমাজ নিরাপদ হবে। তাই প্রশাসনের দৃঢ়তা ও সক্রিয়তাই পারে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে।
নাজেহা আফরিন মায়া
শিক্ষার্থী, ওমরগণি এমইএস ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ
