শিশুরা মহান আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত। প্রতিটি পিতা মাতার চোখের শীতলতা তাদের সন্তান। একটি শিশুর আগমনে পরিবারে যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আধুনিক সময়ে আমরা এই আনন্দ উদযাপনের জন্য শিশুদের ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করতে ভালোবাসি। আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার এই প্রবণতা খুবই স্বাভাবিক। তবে এই স্বাভাবিকতার আড়ালে অনেক সময় শিশুদের ওপর এক অদৃশ্য ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে যায়। ইসলামে এই বিষয়টিকে বলা হয় বদনজর বা নজরে বদ। অনেক সময় আমরা না বুঝেই নিজেদের সন্তানের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াই।
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বদনজরের বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একটি সুন্দর শিশুর ছবি ফেসবুকে বা ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করলে হাজার হাজার মানুষ তা দেখেন। অনেকেই হয়তো প্রশংসা করেন। কিন্তু সবার মনের অবস্থা এক রকম হয় না। কেউ হয়তো অবচেতনভাবেই ঈর্ষা, আক্ষেপ বা সন্তান না থাকার কষ্ট নিয়ে তাকাতে পারেন। আবার অনেক সময় পিতা মাতা নিজেদের অতিরিক্ত মুগ্ধতার ফলেও সন্তানের ওপর বদনজর লাগতে পারে।
বদনজরের ফলে শিশু হঠাৎ অস্বাভাবিক কান্নাকাটি শুরু করে। কোনো কারণ ছাড়াই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায় শিশু মায়ের দুধ পান করা ছেড়ে দেয় বা তার শারীরিক বৃদ্ধি হঠাৎ বাধাগ্রস্ত হয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যেখানে অনেক সময় কারণ খুঁজে পায় না, সেখানে বদনজরের গভীর প্রভাব থাকতে পারে। এটি কোনো কল্পকাহিনী নয়, বরং আমাদের সমাজের এক রূঢ় বাস্তবতা।
ইসলামে বদনজর বা মানুষের দৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাবকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে। এটি কোনো কুসংস্কার বা গ্রাম্য বিশ্বাস নয়। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) বদনজরের বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করেছেন।
সহিহ মুসলিমের একটি নির্ভরযোগ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “বদনজর সত্য। যদি কোনো কিছু তাকদিরকে অতিক্রম করতে পারত, তবে বদনজর তাকদিরকে অতিক্রম করত।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৮৮)
পবিত্র কুরআনেও বদনজরের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুরা ইউসুফের ৬৭ নম্বর আয়াতে হজরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, “হে আমার সন্তানেরা! তোমরা সবাই এক দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ কোরো না, বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।” প্রখ্যাত তাফসিরকারকগণ একমত যে, তাঁর সন্তানরা ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী এবং সুদর্শন। একদল সুদর্শন যুবক একসাথে শহরে প্রবেশ করলে মানুষের বদনজর লাগতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আমাদের করণীয়:
শিশুদের এই অদৃশ্য ক্ষতি থেকে সুরক্ষার জন্য ইসলাম আমাদের সুনির্দিষ্ট কিছু আমল শিখিয়েছে। পিতা মাতা হিসেবে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো সতর্কতা অবলম্বন করা এবং আল্লাহর কাছে সন্তানদের নিরাপত্তা চাওয়া।
প্রথমত, শিশুদের অকারণে সব জায়গায় প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। একান্তই দিতে চাইলে তা অত্যন্ত সীমিত পরিসরে রাখা উচিত।
দ্বিতীয়ত, যখনই কোনো সুন্দর জিনিস বা শিশুর দিকে দৃষ্টি পড়বে, তখন শুধু বাহ্যিক প্রশংসা না করে আল্লাহর বরকত চাইতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন নিজের বা নিজের ভাইয়ের এমন কিছু দেখে যা তাকে মুগ্ধ করে, তখন সে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে। কারণ বদনজর সত্য।” (মুসনাদে আহমাদ)। তাই কাউকে দেখলে ‘মাশাআল্লাহ’ বা ‘বারাকাল্লাহু ফিক’ বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রিয়নবীর শেখানো দোয়া নিয়মিত পড়তে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রাণপ্রিয় নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.) এর সুরক্ষার জন্য এই দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন:
“উয়িজুকুমা বিকালিমা তিল্লাহিত তাম্মাতি, মিন কুল্লি শাইতানিউ ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিল লাম্মাহ।”
অর্থ: আমি তোমাদের দুজনের জন্য আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কালামের মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণী থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর বদনজর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৭১)
এছাড়া সকাল সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক এবং সুরা নাস পড়ে শিশুদের শরীরে ফুঁ দেওয়া একটি অত্যন্ত কার্যকর ও পরীক্ষিত আমল। ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করাও দারুণ সুরক্ষাকবচ।
সন্তান আমাদের কাছে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ আমানত। তাদের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সুরক্ষার বিষয়েও আমাদের সমানভাবে সচেতন হতে হবে। বদনজরের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে প্রিয়নবী (সা.) এর শেখানো পথ অনুসরণ করাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম সমাধান।
ডিএ/
