আনোয়ার হোসেন:
‘শিক্ষক’—ছোট্ট একটি শব্দ, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত মূল্য ও অর্থ অপরিসীম। একটি আদর্শ, সুশিক্ষিত ও মেধাভিত্তিক জাতি গঠনে এই শব্দটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজকের পৃথিবীতে যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক অগ্রগতির দিক থেকে তারা ততটাই উন্নত। আর একটি জাতির এই সার্বিক উন্নয়নের নেপথ্য রূপকার হলেন শিক্ষক।
একজন কৃষক প্রথমে জমি কর্ষণ করেন এবং পরম যত্নে বীজ বপন করেন। বীজ থেকে কোমল চারা গজানোর পর তিনি সেই ক্ষুদ্র চারাগাছটি ঘিরে হৃদয়ে আকাশসমান স্বপ্ন বুনেন—প্রতীকী এক কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের আশায়। একজন শিক্ষকও ঠিক তেমনই। শিক্ষাজীবনের শুরুতেই একটি শিশুর সুপ্ত সম্ভাবনাকে চিনে নিয়ে তিনি তাকে কেন্দ্র করে স্বপ্নের বুনন শুরু করেন। কৃষকের মতো কোনো স্বার্থের প্রত্যাশা ছাড়াই, স্নেহের পরশে ও নিরলস পরিশ্রমে সেই শিশুটিকে ধাপে ধাপে সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দেন। একজন আদর্শ কৃষক যেমন তাঁর চারাগাছকে বৈরী আবহাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সুরক্ষাবলয় তৈরি করেন, তেমনই একজন আদর্শ শিক্ষকও তাঁর ছাত্রকে অসামাজিক ও নীতিহীন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
শিক্ষককে বলা হয় ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। বস্তুবাচক এই বিশ্বে আমরা দেখি, কারিগর যত বেশি দক্ষ ও সুনিপুণ হন, তাঁর সৃষ্টিও ততটাই নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন হয়। একটি সমৃদ্ধ ও নীতিবান জনশক্তি গঠনে দক্ষ ও আদর্শ শিক্ষকের তাই কোনো বিকল্প নেই। কোনো ইমারতের ভিত্তি বা স্তম্ভ যতটা মজবুত হয়, পুরো কাঠামোটি ততটাই সুদৃঢ় থাকে। একইভাবে শিক্ষকের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থী কতটা যোগ্য, সুনাগরিক ও যুগোপযোগী হয়ে উঠবে।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যেকোনো তথ্য সহজে পেতে আমাদের হাতের কাছে গুগল, ইউটিউব বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) রয়েছে। প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে শিক্ষার্থীরা বহুলাংশে স্ক্রিন ও সার্চ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে একজন শিক্ষক কেবল তথ্যের সরবরাহকারী নন; বরং প্রাপ্ত তথ্যকে কীভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়, তথ্যের সত্য-মিথ্যা কীভাবে যাচাই করতে হয় এবং তা কীভাবে জীবনে প্রয়োগ করতে হয়—তার মূল পথপ্রদর্শক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর শিক্ষার্থীদের অন্ধ ও একক নির্ভরতা থেকে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকদের আজ আরও বেশি স্মার্ট, আধুনিক ও প্রযুক্তিবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতা ওল্টানো বা পরীক্ষার খাতায় কিছু বাঁধাধরা উত্তর লিখে আসা নয়; এর প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার গভীর আত্মিক ও নৈতিক সম্পর্কে। বস্তুবাদী এই যুগে যখন বহু সামাজিক সম্পর্ক কেবল যান্ত্রিক বা পেশাগত লেনদেনে রূপ নিয়েছে, তখনো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বন্ধনটি হওয়া উচিত অকৃত্রিম বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও স্নেহের এক পবিত্র আশ্রয়।
একটি জাতিকে মেধা, মনন ও নীতিতে সমৃদ্ধ করতে হলে সেই জাতির কারিগর শিক্ষকদের সঠিক মূল্যায়ন করা রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বোচ্চ নৈতিক দায়িত্ব। একজন শিক্ষক যদি প্রতিনিয়ত জীবনযাত্রার টানাফোড়েন কিংবা সামাজিক অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হন, তবে তাঁর পক্ষে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে আগামী প্রজন্ম গড়ার পবিত্র ব্রত পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষককে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রশংসায় ‘সম্মানীয়’ না বলে, তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থসামাজিক মর্যাদা এবং পেশাগত স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, একটি আলোকময়, মানবিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখ দেখতে হলে আজ আমাদের শিক্ষকদের মর্যাদার আসন সুদৃঢ় করতেই হবে। কারণ শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, আর সঠিক শিক্ষা বাঁচলেই গড়ে উঠবে একটি আদর্শ ও উন্নত বাংলাদেশ।
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি
