আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব বাঁশ দিবস। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাঁশ একটি অতি পরিচিত নাম। গ্রামবাংলার প্রকৃতি থেকে শুরু করে শহরের আধুনিক অন্দরসজ্জা, সবখানেই এর দারুণ কদর। খুব সাধারণ মনে হলেও বাঁশের গুণের কোনো শেষ নেই। তাই এই বহুমুখী উদ্ভিদটির গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং এর সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর আজকের দিনে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব বাঁশ দিবস।
বাঁশ নিয়ে কথা উঠলে আমাদের মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে গ্রামবাংলার স্নিগ্ধ রূপ। বাংলা সাহিত্যেও এর উজ্জ্বল উপস্থিতি রয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অমর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় লিখেছেন, “মম এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য।” এখানে বাঁশের বাঁশি প্রেম ও সুরের প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। আবার যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’ কবিতায় “বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই” লাইনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় শৈশবের সেই মায়াবী স্মৃতি।
সাহিত্য থেকে বাস্তবে ফিরলে বাঁশের ভূমিকা আরও চমকপ্রদ। ২০০৯ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত অষ্টম বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেসে ১৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব বাঁশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশ্ব বাঁশ সংস্থার তৎকালীন সভাপতি কমলেশ সালাম এই দিনটির সূচনা করেন। উদ্দেশ্য ছিল, বাঁশকে কেবল একটি সাধারণ উদ্ভিদ হিসেবে নয়, বরং টেকসই ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা।
অনেকেই হয়তো জানেন না, বাঁশ আসলে কোনো গাছ নয়, এটি এক ধরনের বিশাল ঘাস। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদগুলোর একটি। কিছু প্রজাতির বাঁশ ২৪ ঘণ্টায় ৩৬ ইঞ্চি পর্যন্ত বাড়তে পারে! এর মানে হলো, এটি অন্যান্য গাছের তুলনায় অনেক দ্রুত বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিতে পারে এবং প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন ছড়িয়ে দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ সময়ে বাঁশ তাই প্রকৃতির এক দারুণ আশীর্বাদ।
এবারের বিশ্ব বাঁশ দিবস ২০২৬ এর প্রতিপাদ্য হলো “Bamboo Beyond Borders” বা “সীমানা ছাড়িয়ে বাঁশ”। এই থিম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাঁশের উপযোগিতা কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ঘরবাড়ি নির্মাণ, আসবাবপত্র, কাগজ, রান্নার উপকরণ, এমনকি আধুনিককালের টেকসই পোশাক তৈরিতেও বাঁশের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁশের তৈরি ঘরবাড়ি বেশ নিরাপদ। বাঁশের খুঁটিগুলো ভীষণ শক্ত ও টেকসই হয়, যে কারণে নির্মাণকাজে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এর অ্যান্টি-ফাঙ্গাল এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণের কারণে বাঁশ থেকে উন্নত মানের চারকোল তৈরি করা হয়। এ ছাড়া প্রতিদিনের ব্যবহার্য জিনিস যেমন টুথব্রাশ বা ডিসপোজেবল প্লেট তৈরিতেও এখন প্লাস্টিকের জায়গা নিচ্ছে বাঁশ। আর চীনের সেই মিষ্টি পান্ডাদের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, যাদের প্রধান খাবারই হলো বাঁশ।
বিশ্ব বাঁশ দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। প্রকৃতি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, আর সেগুলো সঠিক ও টেকসই উপায়ে ব্যবহার করার দায়িত্ব আমাদেরই। বাঁশ কেবল একটি পরিবেশবান্ধব বিকল্প নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও দারুণ ভূমিকা রাখছে।
আজকের এই দিনে আমরা প্লাস্টিক বা পরিবেশের ক্ষতি করে এমন জিনিসের বদলে বাঁশের তৈরি পণ্য ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করতে পারি। এতে করে আমাদের চারপাশের পরিবেশ ভালো থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়া সম্ভব হবে।
ডিএ/
