আকাশের দিকে তাকালে নীলের বিস্তার ছাড়া আলাদা করে কিছুই চোখে পড়ে না। অথচ সেই আকাশেই রয়েছে পৃথিবীর জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক অদৃশ্য ঢাল। নাম তার ওজোন স্তর। সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির বড় একটি অংশ আটকে দিয়ে মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদকে সুরক্ষা দেয় এই স্তর। সেই অদৃশ্য প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচের কথা মনে করিয়ে দিতে প্রতিবছর ১৬ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব ওজোন দিবস।
১৯৮৭ সালের এই দিনে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ওজোন স্তর ক্ষয়কারী পদার্থ নিয়ন্ত্রণে ঐতিহাসিক মন্ট্রিয়ল প্রোটোকল। পরে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৬ সেপ্টেম্বরকে ওজোন স্তর সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হচ্ছে।
কিন্তু কেন ওজোন স্তর এত গুরুত্বপূর্ণ?
বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে থাকা ওজোন সূর্যের অতিবেগুনি-বি (UV-B) রশ্মি শোষণ করে। অতিরিক্ত UV-B মানুষের ত্বকের ক্যানসার ও চোখের ছানিসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। শুধু মানুষ নয়, উদ্ভিদ ও বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের ওপরও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
সমস্যার শুরু হয়েছিল মানুষের হাত ধরেই। শিল্পায়নের বিস্তারের সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, রেফ্রিজারেটর, অ্যারোসলসহ বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহৃত ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (CFC), হ্যালন ও অন্যান্য রাসায়নিক বায়ুমণ্ডলে গিয়ে ওজোন অণু ভাঙতে শুরু করে। মেরু অঞ্চলে এর প্রভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ‘ওজোন হোল’ বা ওজোন গহ্বরের মাধ্যমে।
তবে এই গল্পের পরিণতি শুধু আশঙ্কার নয়, আশারও।
মন্ট্রিয়ল প্রোটোকলের আওতায় দেশগুলো ধীরে ধীরে ওজোন ক্ষয়কারী রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ করতে শুরু করে। বিজ্ঞানীদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘস্থায়ী ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের পরিমাণ কমছে এবং ওজোন স্তর পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। বর্তমান নীতিগুলো বহাল থাকলে বিশ্বজুড়ে ওজোন স্তর ১৯৮০ সালের মাত্রায় ফিরতে পারে প্রায় ২০৪০ সালের দিকে; আর্কটিকে ২০৪৫ এবং অ্যান্টার্কটিকায় ২০৬৬ সালের দিকে।
এবারের বিশ্ব ওজোন দিবস তাই আরও একটি কারণে বিশেষ। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য—‘Global Action for a Cooler Planet’ বা ‘শীতলতর পৃথিবীর জন্য বৈশ্বিক উদ্যোগ’। এ বছর কিগালি সংশোধনীরও দশ বছর পূর্তি। ২০১৬ সালে গৃহীত এই সংশোধনীতে জলবায়ু উষ্ণায়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখা হাইড্রোফ্লোরোকার্বন (HFC) ধাপে ধাপে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অর্থাৎ, ওজোন রক্ষার লড়াই এখন শুধু আকাশের একটি স্তর বাঁচানোর বিষয় নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নিরাপদ ও দক্ষ শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করার সঙ্গেও যুক্ত।
ওজোন দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই—মানুষের কর্মকাণ্ড যেমন বৈশ্বিক পরিবেশের সংকট তৈরি করতে পারে, তেমনি বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার সেই ক্ষতি ধীরে ধীরে কাটিয়েও উঠতে পারে। মাথার ওপর অদৃশ্য যে ছাতাটি পৃথিবীকে আগলে রেখেছে, সেটি রক্ষার দায়িত্বও তাই সবার।
শুভ্র/
