শিরোনাম:
Network News BD
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

শব্দের ভেতর সময়ের অনুসন্ধান: সোনিয়া তাসনিমের সাহিত্যভুবন

শব্দশৈলী ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮ PM ১১২ বার পঠিত
শব্দের ভেতর সময়ের অনুসন্ধান: সোনিয়া তাসনিমের সাহিত্যভুবন

ছবি: সংগৃহীত

একজন লেখকের পরিচয় কেবল তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর লেখার বিষয়, সময়কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রশ্ন করার সাহসই নির্মাণ করে তাঁর প্রকৃত সাহিত্যিক পরিচয়। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে সোনিয়া তাসনিম এমন একজন লেখক, যাঁর সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে ক্রমশ যুক্ত হয়েছে গবেষণা, ইতিহাসচেতনা ও সমকালীন বিশ্বের নানা জটিল প্রশ্নের অনুসন্ধান।

সাহিত্যের প্রচলিত কোনো একটি ধারায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি তিনি। কথাসাহিত্য, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, প্রবন্ধ কিংবা রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ—বিষয়ের বৈচিত্র্য তাঁর লেখালেখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর কাছে সাহিত্য মানে শুধু গল্প বলা নয়; বরং সময়কে অনুভব করা, তার অন্তর্গত সংকটকে শনাক্ত করা এবং পাঠকের সামনে নতুন কিছু প্রশ্ন তুলে ধরা।

এই ভাবনার প্রতিফলন পাওয়া যায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোতেও। ‘Z-ভেনম’, ‘বীক্ষণ’, ‘কেনিয়া ভয়ংকর’, ‘অসমাপ্ত’, ‘ফোর্থ ফ্লোর’, ‘আগন্তুক’, ‘মায়ের গয়নার বাক্স’, ‘বিস্তীর্ণ জলছবি’ এবং ‘কেরালার গহীনে’—প্রতিটি বইতেই বিষয় ও আঙ্গিকের ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, কোথাও ইতিহাস ও ঐতিহ্য, কোথাও মানুষের মনোজগত, আবার কোথাও বিজ্ঞান ও মানবিক সম্পর্কের দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। ফলে তাঁর বইগুলো একই সঙ্গে পাঠককে গল্পের ভেতরে নিয়ে যায় এবং ভাবনার একটি নতুন পরিসর তৈরি করে।

এই ধারাবাহিকতায় তাঁর নতুন সংযোজন রাজনৈতিক-সামাজিক উপন্যাস ‘বিপ্রতীপ’। আগামী একুশে বইমেলায় অবসর প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হতে যাওয়া এই উপন্যাসে সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির নানা বাস্তবতা, দ্বন্দ্ব এবং মানুষের অবস্থানকে কথাসাহিত্যের ভেতর দিয়ে দেখার চেষ্টা রয়েছে। তাঁর সাহিত্যচর্চায় সমকালকে ধারণ করার যে প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে, ‘বিপ্রতীপ’ সেই যাত্রারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সাহিত্যের পাশাপাশি সংবাদপত্রের পাতাতেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় সোনিয়া তাসনিম। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো, খবরের কাগজ, আলোকিত বাংলাদেশ এবং বণিক বার্তার ‘সিল্করুট’-এ তাঁর প্রবন্ধ ও কলাম প্রকাশিত হয়েছে। দেশের বাইরে পশ্চিমবঙ্গের ‘পুবের কলম’, ‘আজাদী’ ও ‘জনকণ্ঠ’ এবং প্যারিসভিত্তিক ‘দ্য প্যারিস মেইল’ ও ‘প্যারিস টাইমস’-এও তাঁর লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। সাহিত্য থেকে ইতিহাস, আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে ভূরাজনীতি—বিষয়ের বিস্তৃত পরিসরে তাঁর এই লেখালেখি তাঁকে কেবল কথাসাহিত্যিক নয়, একজন মননশীল প্রাবন্ধিক হিসেবেও পরিচিত করেছে।

তাঁর লেখকসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক গবেষণা। বর্তমানে ‘আমিই নজরুল’ নজরুল চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজী নজরুল ইসলামের মানবিক দর্শন, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবমুক্তির চিন্তা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনকে শুধু সাহিত্যিক পরিসরে নয়, ঔপনিবেশিক সমাজবাস্তবতা ও মানবমুক্তির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখার আগ্রহ তাঁর গবেষণাকর্মে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশ্বশক্তির পরিবর্তিত ভারসাম্য নিয়েও তাঁর গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি রয়েছে। ফলে তাঁর সাহিত্যচর্চার পরিসর ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি থেকে শুরু করে বৃহত্তর সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বরাজনীতির জটিল বাস্তবতা পর্যন্ত বিস্তৃত।

সাহিত্য ও গবেষণায় তাঁর কাজের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। তিনি চাতক সম্মাননা (ভারত), সাহিত্য দিগন্ত লেখক পুরস্কার, বাঙালীর কণ্ঠ পুরস্কার, ঢাকা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার এবং উদার আকাশ ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উৎসব সম্মাননাসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি ‘প্রমীলা নজরুল অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্যও মনোনীত হয়েছেন।

তবে পুরস্কার বা স্বীকৃতির চেয়েও তাঁর কাছে লেখালেখির দায়টি সম্ভবত বড়। নিজের সাহিত্যভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাহিত্য আমার কাছে কেবল শব্দের শিল্প নয়; এটি সময়কে লিপিবদ্ধ করার এক নৈতিক দায়বদ্ধতা।”

এই একটি বাক্যের মধ্যেই তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়। সময়ের ঘটনাকে শুধু দেখার পরিবর্তে তার অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে দেখা, ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র অন্বেষণ করা এবং মানুষের জীবন ও সমাজের নানা প্রশ্নকে সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরা—এই পথেই এগিয়ে চলেছেন সোনিয়া তাসনিম।

দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে একজন লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা নয়, বরং তাকে ভাবতে শেখানো। সোনিয়া তাসনিমের লেখালেখির ভেতরে সেই ভাবনার জায়গাটিই ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাহিত্য, গবেষণা ও সমকালীন বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের স্বতন্ত্র সাহিত্যিক স্বর নির্মাণের পথে। তাঁর এই অভিযাত্রা ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্য ও গবেষণার পরিসরে আরও বিস্তৃত হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়।

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!