মিফতাহুল জান্নাত মৌমিতা:
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের এই ক্যাম্পাসে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট শিক্ষার্থীদের জীবনকে করেছে নানা দিক থেকে চ্যালেঞ্জিং।
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শুধু একটি ক্যাম্পাস নয়; বিশ্ববিদ্যালয় মানে নিজের হয়ে ওঠার একটি ঠিকানা। অথচ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর জীবনে সেই ঠিকানাটিই আজও অসম্পূর্ণ। একদিকে পুরান ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবন, অন্যদিকে আবাসনের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে জবি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে পুরান ঢাকার ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়, যানবাহনের শব্দ আর ইতিহাসের ছাপ। কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের মাঝেই অনেক শিক্ষার্থীর জীবন যেন অস্থায়ী। ক্লাস শেষ হলেও তাদের দিন শেষ হয় না; কারণ এরপর শুরু হয় বাড়ি ফেরার কিংবা মেসে ফেরার দীর্ঘ পথ।
হল শুধু থাকার জায়গা নয়
একজন শিক্ষার্থীর কাছে হল শুধু মাথা গোঁজার জায়গা নয়। হল মানে নিজের একটি ছোট্ট ঘর, রাত জেগে পড়াশোনার সুযোগ, পরীক্ষার আগে বন্ধুদের সঙ্গে প্রস্তুতি, অসুস্থ হলে পাশে কাউকে পাওয়া এবং সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের জীবনের একটি অংশ হিসেবে অনুভব করার সুযোগ। কিন্তু জগন্নাথের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে সেই অভিজ্ঞতা এখনও অধরা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের ইতিহাসও দীর্ঘ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে জগন্নাথ কলেজের অধীনে ১১ থেকে ১২টি হল ছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক ব্যক্তি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবৈধ দখলের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেগুলো উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা পুনরায় হল উদ্ধারের জন্য কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও নেই কোনো দৃশ্যমান ও স্থায়ী সমাধান ।
মেসজীবনের আর্থিক চাপ
আবাসিক হলের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মেসে থাকতে হয়। পুরান ঢাকা, সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, গেন্ডারিয়া কিংবা অন্যান্য এলাকায় বাসা বা মেসের সিট ভাড়া নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করে।
বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা-খাওয়া, যাতায়াত ও পড়াশোনার খরচ একসঙ্গে বহন করা সহজ নয়। অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি বা পার্ট-টাইম কাজ করে নিজের খরচ চালাতে হয়। এতে পড়াশোনার জন্য নির্ধারিত সময় ও মনোযোগও কমে যেতে পারে।
শুধু আর্থিক চাপ নয়, মেসজীবনে নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত পরিসর, পড়াশোনার পরিবেশ এবং মানসিক স্বস্তির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যাতায়াতের দীর্ঘ ক্লান্তি
ক্যাম্পাসের আশপাশে থাকার সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত কিংবা আশপাশের জেলা থেকে যাতায়াত করতে হয়। মিরপুর, উত্তরা, সাভার, গাজীপুর কিংবা নারায়ণগঞ্জের মতো দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হয়।
ঢাকার যানজট, গণপরিবহনের ভিড় ও দীর্ঘ যাত্রা শুধু সময়ই কেড়ে নেয় না; দিনের শেষে তৈরি করে শারীরিক ক্লান্তিও। ফলে পড়াশোনা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও শক্তি অনেকের ক্ষেত্রেই সীমিত হয়ে আসে।
তবুও প্রতিকূলতার মধ্যেই এগিয়ে চলছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আবাসন সংকট, দীর্ঘ যাতায়াত কিংবা মেসজীবনের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা নিজেদের দক্ষতা ও সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়কে সমৃদ্ধ করছেন।
প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান
আবাসন সংকট শুধু থাকার জায়গার সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ, নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি এবং শিক্ষার পরিবেশ। পর্যাপ্ত ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও গবেষণায় আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসনে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য টেকসই আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাজীবনের ঠিকানা হয়ে ওঠে, যখন সেখানে শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়—থাকার নিরাপদ জায়গা, পড়াশোনার পরিবেশ এবং নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগও থাকে।
জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের হলের দাবি তাই শুধু একটি ভবনের দাবি নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের দাবি।
হয়তো একদিন ক্লাস শেষে জবি শিক্ষার্থীদের আর শেষ বাসের সময় নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। দূরের কোনো শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে হবে না। সেদিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু হাজারো তরুণের স্বপ্নের ক্যাম্পাস থাকবে না—হয়ে উঠবে তাদের নিরাপদ ঠিকানাও।
লেখক: শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
