১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেসকো দিবসটি পালনের সূচনা করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযথ মর্যাদায় দিনটি পালিত হচ্ছে। শিক্ষক দিবস উপলক্ষে শিক্ষকদের নিয়ে নিজেদের ভাবনা ও মতামত তুলে ধরেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। সংকলন করেছেন চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মুহিবুল হাসান রাফি।
বদলে যাওয়া ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক
একসময় শিক্ষক মানেই ছিলেন শ্রদ্ধা, আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক; শিক্ষার্থীরাও ছিলেন শিক্ষকের কাছে সন্তানের মতো। সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল জ্ঞান, শাসন, মমতা ও মানবিকতা। সময় বদলেছে, বদলেছে সম্পর্কের ধরনও। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দূরত্ব বেড়েছে। শ্রেণিকক্ষের সম্পর্ক সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে পাঠদান, পরীক্ষা ও ফলাফলের আনুষ্ঠানিকতায়। কোথাও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি, আবার কোথাও শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধের সংকট সেই সুন্দর সম্পর্ককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। তবে এখনো অসংখ্য শিক্ষক শিক্ষার্থীর সাফল্যকে নিজের অর্জন মনে করেন; শিক্ষার্থীরাও তাঁদের প্রতি রাখে গভীর শ্রদ্ধা। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে প্রয়োজন শুধু প্রশংসা নয়, পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও মানবিকতার সেই সেতুটি পুনর্গঠনের অঙ্গীকার। কারণ, শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ে নয়, সম্পর্কের উষ্ণতাতেও গড়ে ওঠে।
— জান্নাতুল ফেরদাউস রিতা, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির দ্রষ্টা
একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানই করেন না, তিনি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। তাঁর জ্ঞান, আদর্শ ও প্রেরণায় বদলে যেতে পারে একজন শিক্ষার্থীর জীবন; আলোকিত হতে পারে একটি পরিবার, সমাজ ও প্রজন্ম। শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞানের পাশাপাশি সত্য, ন্যায়, সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার বীজ বপন করেন। ভুল থেকে শেখা, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগান। প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে তথ্যের স্রোত থেকে সঠিক জ্ঞান বেছে নেওয়া ও মানবিক মূল্যবোধ ধরে রাখতেও শিক্ষকের ভূমিকা অপরিহার্য। তাঁদের হাত ধরেই তৈরি হন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, প্রশাসক ও সমাজকর্মী। তাই শিক্ষক কেবল বর্তমানের শিক্ষার্থীদেরই শিক্ষাদান করেন না, বরং আগামীর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ করেন। আমাদের জীবনে শিক্ষকেরাই পথচলার অন্যতম স্বপ্নসারথি।
— আফিয়া আলম, শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
মানুষ গড়ার নেপথ্যশিল্পী
বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু শিক্ষকদের সম্মান জানানোর নয়, জাতি গঠনে তাঁদের অবদান নতুন করে স্মরণ করারও উপলক্ষ। জ্ঞান, মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার পাঠ দিয়ে শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষায় সফল নয়, দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলেন। তাই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার্থীর নৈতিক কর্তব্য। একই সঙ্গে একজন শিক্ষকের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ, যথাযথ সম্মান ও আর্থিক নিশ্চয়তা। সামাজিক অবক্ষয়, দুর্নীতি ও অস্থিরতার সময়ে শিক্ষকেরাই মূল্যবোধের সবচেয়ে শক্তিশালী বাতিঘর। তাঁদের সমস্যার সমাধান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। কারণ, একটি শিক্ষিত জাতি শুধু জ্ঞান দিয়ে নয়, আদর্শ মানুষ গড়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায়। আর সেই মানুষ তৈরির নেপথ্যে থাকেন শিক্ষক, জাতির নীরব নির্মাতা।
— তাসপিয়া সোলতানা জেমি, সাবেক শিক্ষার্থী, সাতকানিয়া সরকারি কলেজ।
আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, আম্মু
শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সব শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মুহূর্তে আমার মনে সবার আগে আসে আম্মুর কথা। কারণ, বই হাতে নেওয়ার আগেই তিনিই আমাকে জীবনের প্রথম পাঠ দিয়েছেন। তাঁর হাত ধরেই হাঁটা, তাঁর মুখের ভাষায় কথা বলা; আর তাঁর কাছেই শিখেছি সত্যের পথে চলা, বড়দের সম্মান, ছোটদের ভালোবাসা ও বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। জীবনের কঠিন সময়ে তিনি ছিলেন আমার সাহসের আশ্রয়। ব্যর্থতায় ভেঙে পড়লে তাঁর একটি কথা ‘আবার চেষ্টা করো, তুমি পারবে’ ফিরিয়ে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস। একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না, মানুষ হয়ে ওঠার পথও দেখান। সেই অর্থে আম্মুই আমার প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম পথপ্রদর্শক ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। জীবনের যত দূরেই যাই, তাঁর শেখানো মূল্যবোধই থাকবে আমার পথচলার আলো।
— মারিয়া আক্তার, শিক্ষার্থী, গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সেস, ঢাকা।
ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম কারিগর
একজন শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার, দ্বিতীয় বিদ্যালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; আর সেই পথের অন্যতম নির্মাতা হলেন শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভুল শুধরে দেন, স্বপ্নকে পথ দেখান, হতাশায় সাহস জোগান এবং মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে দেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অসংখ্য শিক্ষক পরম নিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করছেন। প্রযুক্তির যুগে তথ্যের অভাব নেই; কিন্তু কোনটি সত্য, কীভাবে তা কাজে লাগাতে হবে এবং জ্ঞানকে মানবিকতায় রূপ দিতে হবে—সেই বোধ তৈরি করেন শিক্ষক। তাঁদের কঠোরতা অনেক সময় শাসন নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়িত্ববোধ; তাঁদের উৎসাহ হয়ে ওঠে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। তাই শিক্ষক দিবস শুধু শুভেচ্ছা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়; শিক্ষকের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের দিন।
— প্রমি রানী দাশ, শিক্ষার্থী, ওমরগণি এম.ই.এস. কলেজ।
ভাই হয়েও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক
মানুষের জীবনে এমন কিছু মানুষ আসেন, যাঁদের অবদান কোনো বিশেষ দিনের শুভেচ্ছা কিংবা কয়েকটি শব্দে প্রকাশ করা যায় না। আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ আমার ভাইয়া। প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে বহু শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কাছে জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পাঠ পেয়েছি। কিন্তু আমাকে শুধু পড়াশোনায় নয়, জীবনবোধেও গড়ে তুলেছেন তিনি। আমার শিক্ষার জন্য নিজের সময়, শ্রম ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন; প্রয়োজনে বই কিনে দিয়েছেন, নিজ হাতে পড়িয়েছেন। আমি যখন সংশয়ে থমকে গেছি, তিনি সাহস জুগিয়েছেন; নিজের সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান থাকার সময়েও তিনি আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন। তাই ভাইয়া আমার কাছে শুধু বড় ভাই নন—তিনি অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও প্রেরণার উৎস। আমার জীবনের অনেক বড় শিক্ষাই এসেছে তাঁর ত্যাগ ও ভালোবাসা থেকে।
— জাকিয়াতুল হাওয়া তাজনুর, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ।
সভ্যতার অগ্রযাত্রায় শিক্ষকের ভূমিকা
সভ্যতার অগ্রযাত্রার প্রতিটি অধ্যায়ের নেপথ্যে রয়েছে শিক্ষকের আলোকিত স্পর্শ। মা-বাবা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান, আর শিক্ষক তাকে জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলোয় প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। তাই শিক্ষক শুধু পাঠদাতা নন, তিনি মানুষের দ্বিতীয় জন্মদাতা, ভবিষ্যৎ নির্মাণের নীরব কারিগর। তাঁর শিক্ষা মানুষকে সভ্যতার শিখরে পৌঁছায়; দেখায় সঠিক পথের দিশা। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত—তথ্যের ভিড়ে সত্য চেনানো, নৈতিকতার ভিত্তি শক্ত করা এবং শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। মোমবাতির মতো নিজে জ্বলে যাঁরা অন্যের পথ আলোকিত করেন, সেই সব শিক্ষকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
— আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ, শিক্ষার্থী, সাতকানিয়া সরকারি কলেজ।
শিক্ষকের হাতেই ভবিষ্যতের ভিত
বিশ্ব শিক্ষক দিবস হলো জ্ঞান, বিবেক ও মানবিকতার আলোকবর্তিকাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা, চরিত্র, নৈতিকতা ও স্বপ্নকে সঠিক পথে গড়ে তোলেন। তাঁর একটি পরামর্শ, উৎসাহ কিংবা শাসন অনেক সময় বদলে দেয় একটি জীবন। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের আড়ালে থাকে তাঁদের নিরলস প্রস্তুতি, ধৈর্য, শ্রম ও নীরব ত্যাগ। তাঁদের হাত ধরেই চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিল্পী কিংবা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি হয়। তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিতকে সম্মান করা। জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে যাঁরা প্রজন্মের পথ দেখান, সেই সব শিক্ষককে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
— মুহাম্মদ সাকি কাউসার, শিক্ষার্থী, কামালে ইশকে মুস্তফা (সা.) ফাজিল মাদ্রাসা।
শুভ্র/
