রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে ফুলেল সংবর্ধনা প্রদান এবং তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসার পর আলোচনায় এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা আবুল হাশেম। তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে রাখা নিয়ে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও রুয়েট উপাচার্য উভয়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা আবুল হাশেম ২০০০ সালে টেকনিশিয়ান হিসেবে রুয়েটে চাকরি শুরু করেন। বর্তমানে তিনি একটি গবেষণাগারে মূল দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কয়েক মাস ধরে নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভূমিকা সামলাচ্ছেন। তাঁর অধীনে ৭৫ জন আনসার সদস্য কর্মরত আছেন এবং পুরো রুয়েট ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বও তাঁর ওপর ন্যস্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনকে তাঁর নিজ দপ্তরে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর একটি ছবি জনসমক্ষে আসে। এছাড়া লিটনের পক্ষে নৌকা প্রতীকের লিফলেট হাতে প্রচারণায় নেতৃত্ব দেওয়ার দৃশ্যসংবলিত কিছু ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই কর্মকর্তা আবুল হাশেমের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আবুল হাশেমের মতো রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে কার্যত পুরো রুয়েটকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তিনি আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। রুয়েটের একজন কর্মকর্তা হয়েও তিনি কীভাবে একটি রাজনৈতিক দলের মেয়রের প্রার্থীর লিফলেট নিয়ে প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন?’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘দেশজুড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কোনো ব্যক্তির হাতে নিরাপত্তার চাবি থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে শঙ্কিত।’
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিরাপত্তা কর্মকর্তা আবুল হাশেম দাবি করেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং এখনো নেই। তিনি জানান, রুয়েট কর্মকর্তা সমিতির দায়িত্ব পালনকালে প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা অনুযায়ী এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন।
আবুল হাশেমের ভাষ্য, ‘যে ছবিগুলো প্রচার করা হচ্ছে, তা কর্মকর্তা সমিতির আহ্বায়ক কমিটিতে থাকা অবস্থায় তোলা। আমি সমিতির নির্বাচিত সদস্যসচিব ছিলাম। কর্মকর্তা সমিতির প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবেই তৎকালীন মেয়রকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে নয়। সেই ছবিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হচ্ছে।’
নির্বাচনের প্রচারণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনো কোনো প্রার্থীর প্রচারে যাইনি। কর্মকর্তা সমিতির ব্যানারে অন্য সদস্যরা যখন গিয়েছিলেন, তখন হয়তো তাঁদের সঙ্গে আমাকে দেখা গেছে।’
এদিকে কর্মকর্তা আবুল হাশেমের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে তাঁর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন রুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক।
তিনি বলেন, ‘আবুল হাশেম কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। রুয়েটের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে তাঁর মতো একজন সাহসী ও সৎ কর্মকর্তার প্রয়োজন বলেই তাঁকে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
উপাচার্য আরও জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর আবুল হাশেম ক্যাম্পাসে মাদক ও অবৈধ কার্যক্রম রোধে শক্ত ভূমিকা রেখেছেন।
উপাচার্যের দাবি, ‘যাঁরা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভিত্তিহীন প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের অনেকেই মূল বিষয় থেকে নজর ঘোরাতে এবং ক্যাম্পাসে বিতর্ক তৈরি করার উদ্দেশ্যে এসব করছেন।’
