একসময় বাংলার পথ মানেই ছিল ধুলো মাখা মেঠোপথ, পথের দুপাশে কাশফুলের দোলা, বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আসা রোদ আর দূরে কোথাও বয়ে চলা কোনো অচেনা নদী। বর্ষায় উঠোন ডুবে যেত জলে, শরতে নীল আকাশ আর বিকেল নামলেই মাঠের ওপারে গরুর গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যেত অন্ধকারে। সেই বাংলার ভেতর দিয়েই একদিন হেঁটে বেড়িয়েছিল অপু। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপুর চোখে দেখা সেই বাংলা ছিল শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, ছিল বিস্ময়ের এক পৃথিবী। প্রকৃতির তুচ্ছ বিষয়ের মাঝেও সে খুঁজে পেত জীবনের নতুন অর্থ। সেখানে প্রকৃতি গল্পের পটভূমি নয়, তবে প্রকৃতিই যেন গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র।আজ সেই বাংলার দিকে তাকালে কোথাও কোথাও অপুর চোখটাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। মেঠোপথের জায়গায় পাকা রাস্তা, পুকুরের জায়গায় দালান, বাঁশঝাড়ের জায়গায় বসতি। উন্নয়নের ভিড়ে আমরা হয়তো এগিয়েছি অনেক দূর, কিন্তু পেছনে ফেলে এসেছি এমন এক বাংলাকে, যে বাংলাকে বিভূতিভূষণ অপুর চোখ দিয়ে আমাদের চিনিয়েছিলেন। তাই প্রশ্ন জাগে, অপুর সেই বাংলা কি সত্যিই হারিয়ে গেছে? নাকি বদলে গেছে শুধু আমাদের দেখার চোখ? এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মতামত জানিয়েছেন কয়েকজন তরুণ শিক্ষার্থী।
অপুর চোখে প্রকৃতির বিস্ময়
– প্রজ্ঞা দাস, শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে অপুর কাছে প্রকৃতি কোনো জড় বস্তু ছিল না, তা ছিল এক জীবন্ত বিস্ময়লোক। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের মেঠোপথ, বাঁশঝাড়, শ্যাওলা ও কচুরিপানায় ভরা পুকুর, কাশবন কেবল একটি গ্রামীণ পটভূমি নয়, বরং তা ছিল অপু-দুর্গার বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর বালুচর, বুনো ফুলের গন্ধ, মেঘের ডাক, কলার পাতার ওপর বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ, ডালিম গাছের ডালে বসা কাঠবিড়ালির চপলতা, দোয়েল-বাবুই পাখির ওড়াউড়ি আর পাতার ফাঁকে আলো-ছায়ার খেলা এসবই অপুর মনে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ তৈরি করত। সে প্রকৃতির এই নির্জনতাকে ভয় পেত না, বরং পরম শান্তিতে উপভোগ করত। অপুর চোখ দিয়ে লেখক যান্ত্রিক জীবনের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া আদিম ও বিশুদ্ধ প্রকৃতিকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। মূলত অপুর বিস্ময়ভরা চোখে নিহিত ছিল প্রকৃতির সবচেয়ে সত্য ভাষ্য, তা হলো খুব সাধারণ জিনিসের মধ্যেও অসীম আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়।
বিভূতিভূষণের বাংলায় মানুষের মাঝে প্রকৃতি কথা বলে
– সৈকত মল্লিক, শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী উপন্যাসে গ্রামবাংলার প্রকৃতি যেন এক জীবন্ত মানবিক সত্তা। শরতের শিশিরস্নাত সকাল, সবুজ তরুলতা, বর্ষার ঘন বাদল কিংবা মেঠোপথের নির্জনতা–সবকিছুতেই লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার চিরচেনা সৌন্দর্য। প্রকৃতির সঙ্গে অপু ও দুর্গার যে নিবিড় সখ্য, তা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। দুর্গার দুরন্ত শৈশব আর অপুর কৌতূহলী দৃষ্টি প্রকৃতিকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। কখনো বনজঙ্গলের ঝোপঝাড়ে, কখনো পাখির কিচিরমিচিরে আবার কখনো মেঠোপথের অজানা সৌন্দর্যে তারা খুঁজে পেয়েছে আনন্দের নতুন জগৎ। প্রকৃতিই যেন তাদের শৈশবের পাঠশালা, যেখানে প্রতিটি ঋতু শেখায় জীবনের নতুন পাঠ। বিভূতিভূষণের লেখায় প্রকৃতি কেবল দৃশ্যপট নয়, মানুষের বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। অথচ সময়ের পরিবর্তনে সেই চিরচেনা গ্রামবাংলার সৌন্দর্য ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। অপুর চোখে দেখা যে সবুজ, সজীব ও মায়াময় বাংলার সঙ্গে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক ছিল, আজ তা অনেকটাই স্মৃতির অংশ। তাই বিভূতিভূষণের সাহিত্য পাঠ মানে শুধু প্রকৃতিকে দেখা নয়, হারিয়ে যাওয়া বাংলাকে নতুন করে অনুভব করা।
রেললাইনের ওপারে যে পৃথিবী
– ইফতেখার রবিন, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী উপন্যাসে অপুর চোখে রেললাইন যেন চেনা পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে অজানার পথে খুলে যাওয়া এক আশ্চর্য জানালা। গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনের বাইরে যে বিশাল পৃথিবী, তার বিচিত্র রূপ দেখার আকাঙ্ক্ষা অপুর কিশোর মনে গভীর বিস্ময় জাগায়। দূর দিগন্ত থেকে ছুটে আসা রেলগাড়ি তাকে শোনায় অচেনা জীবনের ডাক, দেখায় দূরদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন। রেললাইন তাই তার কাছে কেবল যাত্রাপথ নয়, বরং মুক্তির প্রতীক, কৌতূহলের দিগন্ত এবং নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের প্রতিশ্রুতি। অপুর চোখে রেললাইনের ওপারে যেন অপেক্ষা করে এমন এক জগৎ, যেখানে প্রতিটি অজানা পথ নতুন বিস্ময় আর অনন্ত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। অপুর কাছে এই রেললাইনই যেন স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের সেতুবন্ধ, যেখানে দাঁড়িয়ে সে অনুভব করে দূরকে কাছে পাওয়ার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। তার কৌতূহলী চোখে রেলগাড়ির ছুটে চলা মানে জীবনের স্থবিরতা ভেঙে অজানার দিকে এগিয়ে যাওয়া। প্রকৃতপক্ষে, রেললাইনের ওপারে যে পৃথিবী, তা শুধু ভৌগোলিক দূরত্বের নয়; তা মানুষের চিরন্তন মুক্তিপিপাসা, স্বপ্নবিস্তার ও অসীমকে জানার আকুলতারও প্রতিচ্ছবি।
অপুর চোখে হারিয়ে যাওয়া সেই বাংলা
– সজিব হোসেন, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীতে অপুর চোখে ধরা পড়ে যে বাংলার প্রকৃতি, তা কেবল স্মৃতিকাতরতার অনুষঙ্গ নয়; বরং এক স্বতন্ত্র ভূপ্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। কাশবন, সবুজ-শ্যামল প্রান্তর, নিসর্গঘেরা গ্রাম, পুকুরপাড় আর রেললাইনের বিস্ময়–সব মিলিয়ে অপুর বাংলায় প্রকৃতি ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। কিন্তু সময়ের পালাবদলে নেইতো সেই চিরচেনা পথঘাট, কাঁদামাটি, নির্জন প্রকৃতি। হারিয়ে যাচ্ছে পুরনো মহব্বত, সহজ সরল মানুষের মাঝেও দেখা মিলেছে পুরনো ভাবগাম্ভীর্য্য, কেমন যেন এক অদ্ভুত যান্ত্রিকতা। অথচ এক সময়ে এসবের কমতি ছিল না। সময়ের বিবর্তনে সেই গ্রামীণ ভূদৃশ্য আজ নগরায়ণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও পরিবেশবিনাশের অভিঘাতে ক্রমশ বিপন্ন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় সহাবস্থান একসময় বাংলার পরিচয় নির্মাণ করেছিল, তা যেন আজ অনেকাংশে ক্ষয়িষ্ণু মনে হয়। এখন শুধু মনে হয় অপুর চোখে দেখা সেই বাংলা নিছক অতীত নয়, বর্তমানের পরিবেশ-বাস্তবতা পরিমাপেরও এক প্রাসঙ্গিক মানদণ্ড।
অপুর বাংলায় প্রকৃতি হারালে কী মানুষ হারায়?
– ফারজানা আক্তার, শিক্ষার্থী,ইডেন মহিলা কলেজ।
অপুর দিনগুলো ইছামতীর জলের ধারায় স্নিগ্ধ কাব্যের মতো বয়ে যেত। তার শৈশব মানেই ছিল ঘাসফুলের গন্ধ, শেফালির ঝরে পড়া ভোর আর মেঠোপথ জুড়ে পাখির ডানায় ওড়া এক অপার মুক্তি। অপু শুধু প্রকৃতিরই নয় মানুষেরও ছিল বিশ্বস্ত ঠিকানা। কিন্তু আজ সেই প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন ধসূর হয়ে গিয়েছে। এই পাথরের শহর যেন কংক্রিটের এক নির্মম খাঁচা। যেখানে জানালার বাইরে সবুজ পাতার বদলে টাঙানো থাকে রঙিন বিজ্ঞাপনের ব্যানার, আর শিশুমুখের মুক্ত হাসির বদলে খেলা করে কৃত্রিম আলোর নীল আভা। গাছপালা হারিয়ে আজ হারিয়ে গেছে মানুষের ভেতরের সেই আদিম মায়া কিংবা নদীর মতো ছুটে চলার আকুতি। আমরা নিসর্গের সেই চিরন্তন ছন্দকে ভুলে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই কেমন এক নিথর যান্ত্রিক পুতুলে পরিণত করেছি। শেকড়হীন এই ইট-পাথরের জীবনে মানুষ আজ নিজেই নিজের পরবাসী, নিসর্গ হারাতে হারাতে আজ হারিয়ে ফেলেছি মনুষ্যত্ব ও প্রাণের নিখাদ স্পন্দন।
অপুর চোখে ফিরে দেখা সেই বাংলা
– মোঃ রিয়াদ হোসেন, শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ
বিভূতিভূষণ অপুর চোখে নিখুঁতভাবে চিত্রিত করেছেন তৎকালীন বাংলাকে। বাংলার প্রকৃতি, মানুষজন, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও যান্ত্রিক বিবর্তন সহজেই ধরা পড়ে অপুর চোখে। নিশ্চিন্দিপুরের বাগান, মাঠ, কাশবন, পুকুর, ঝড়ের দিনে ছেলেমেয়েদের আম কুড়ানো, শৈশবের দুরন্তপনা ও সখ্যতা—সবই বাংলার চিরচেনা আবহ। অপুর মাধ্যমেই বিভূতিভূষণ ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার সন্তানদের কৌতূহলী শৈশব, দুরন্ত কৈশোর ও সংসার জীবনের টানাপোড়েন। কাল্পনিক ভূতের ঝুঁঝু থেকে যে দৌড়ের শুরু হয়, সে দৌড় বাংলার সরল মানুষদের চিরাচরিত—তা অপু ও অন্যান্য চরিত্রদের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। পথের পাঁচালী-তে অপুর ট্রেন দেখা ও গ্রাম থেকে শহরমুখীতা বাংলার এক ভিন্নধর্মী যান্ত্রিক রূপ লেখক অপুর চোখে তুলে ধরেছেন। বিভূতিভূষণের সৃষ্টি অপুর চরিত্রের পূর্ণতা দান করেছেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার বিভূতিভূষণের সৃষ্টি ও বাংলার রূপকে করেছে অনবদ্য। অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না, ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো অপুকে বাংলার সন্তানদের মাঝে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। যান্ত্রিক জীবন আর চার দেয়ালের মাঝে স্ক্রিনের সামনে জীবনকে সঁপে দিতে নেই। মাঝে মাঝে অপুর মতোই প্রকৃতিতে খুঁজে নিতে হয় অবসর। প্রকৃতিপ্রেম, ভাবুক ও কৌতূহলী উদ্দীপনা বাংলার সকল অপুর জীবনকে মানবিক করে তুলুক।
শুভ্র/
