শিরোনাম:
Network News BD
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

রূপসী বাংলার চন্দ্রদ্বীপ ও আজকের বরিশাল

রকমারি ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৪১ PM ৫১ বার পঠিত
রূপসী বাংলার চন্দ্রদ্বীপ ও আজকের বরিশাল

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি সম্পাদিত

তাসরিফা পুষ্পিতা রোশনি:

ভোরবেলা কীর্তনখোলা নদীর কুয়াশা ভেদ করে যখন লঞ্চের সাইরেন বাজে, তখন মনে হয় লঞ্চের চাকার সাথে সাথে যেন পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে কয়েক শতাব্দী। স্টিমারঘাটের পন্টুরে পা রাখতেই নাকে এসে লাগে সুপারি পাতার গন্ধ আর পুরোনো ইটের স্যাঁতসেঁতে সুবাস। এই সুবাসটাই তো বরিশাল। কিন্তু শুরুতেই যে প্রবাদের চেনা বুলি ঝেড়ে ফেলে এই জনপদকে বুঝতে চেয়েছিলাম, তাতে হয়তো একটা পলিমাটির সুবাস ছিল, কিন্তু জীবনানন্দের চশমার কাচে জমে থাকা আলো বা শেরে বাংলার বজ্রকঠিন কণ্ঠের সেই ঐতিহাসিক উত্তাপ পুরোটা ধরা দেয়নি। যদি বরিশালকে সত্যই বুঝতে হয়, তবে তার খেরোখাতা খুলতে হবে প্রাক-মুঘল চন্দ্রদ্বীপের রাজসভা থেকে, কিংবা সোজা চলে যেতে হবে ধানসিঁড়ি নদীর বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা এক উদাসীন কবির চিন্তার রাজ্যে।

বরিশাল বাংলাদেশের মানচিত্রের এক জীবন্ত আখ্যান। এখানকার একেকটি নদী আর ইটের কোণায় লুকিয়ে আছে ইতিহাসের একেকটি জীবন্ত চরিত্র। যদি গল্পের সুতো টানি, তবে সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। শহরের অলিগলি পেরিয়ে একটু ভেতরে হাঁটলেই কান পাতলে শোনা যায় তাঁর সেই চিরচেনা আক্ষেপ—“বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর”। এই বরিশালের আকাশ, ধানক্ষেত আর জলের চ্যুতিই তো তাঁর কবিতার রক্তকোষ। আর তাঁর ঠিক পাশেই ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর জননী, কবি কুসুমকুমারী দাশ। ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়া সেই পংক্তি—“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”—আজও যেন এই জনপদের প্রতিটি মোড়ে সাইনবোর্ডের মতো প্রহর গুনে চলে।

বরিশাল বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে থাকা এক মহাকাব্যিক রূপান্তর। এর ইতিহাস অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাক-মুঘল আমলে। তখন এই বিস্তৃত নিম্নভূমি পরিচিত ছিল ‘চন্দ্রদ্বীপ’ বা ‘বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ’ রাজ্য হিসেবে। সুপ্রাচীন কচ্ছপাকার এই দ্বীপরাজ্যটি ছিল নদ-নদী আর জলাভূমি ঘেরা এক প্রাকৃতিক দুর্গ। রাজা দনুজমর্দন দেবের প্রতিষ্ঠিত চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য শত শত বছর ধরে ধরে রেখেছিল স্বাতন্ত্র্য। পরবর্তীতে মুঘলদের সুবা বাংলা দখলের পর এবং পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের ক্রমান্বয়ে জলদস্যুতা প্রতিরোধে এই অঞ্চল এক রণকৌশলগত দুর্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ছাঁচে পড়ে এই জনপদের প্রশাসনিক সীমানা বারবার পুনর্গঠিত হয়। ১৭৯৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বিশাল অববাহিকাকে ‘বাকেরগঞ্জ’ জেলা হিসেবে প্রশাসনিক কাঠামো প্রদান করে। তবে ১৮০১ সালে যখন এর প্রশাসনিক সদর দপ্তর কীর্তনখোলার কোল ঘেঁষে থাকা বরিশালে স্থানান্তরিত হয়, তখন থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ও মানচিত্রে ‘বরিশাল’ নামের আত্মপ্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা।

নামকরণের উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদ ও ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে তিনটি চমকপ্রদ তর্ক ও জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। প্রথমটি উদ্ভিদসংক্রান্ত—অতীতে এই পলিগঠিত অববাহিকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিত বিশাল ও দীর্ঘকায় শালগাছের অরণ্য, যা লোকমুখে ‘বর-শাল’ থেকে বরিশাল রূপ নেয়। দ্বিতীয় মতামতটি বাণিজ্যিক ইতিহাসের—উপকূলীয় লবণ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশ বণিকদের কাছে এটি পরিচিত ছিল ‘বরি-সল্ট’ (Bori-Salt) নামে, যা কালক্রমে ভাষার ভাঙাগড়ায় ‘বরিশাল’-এ পরিণত হয়। আর তৃতীয় মতামতটি লোকায়ত ও নদীকেন্দ্রিক—এখানকার অসংখ্য বিল ও জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া বিপুল শোল মাছের প্রাচুর্য থেকেই নাকি ‘বর-শোল’ বা বরিশাল নামের উৎপত্তি।

এই ভূখণ্ডের প্রকৃত চালিকাশক্তি এর নদীমাতৃক বাস্তুতন্ত্র। কীর্তনখোলা, বলেশ্বর, ধানসিঁড়ি, মেঘনা কিংবা হরিণপাশার মতো শক্তিশালী জলধারা এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, মাটি ও অর্থনীতিকে রূপদান করেছে। এর উর্বর পলিমাটি ও শস্যের বিপুল প্রবৃদ্ধি দেখেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

গল্পের এই ক্যানভাসে রঙ ছড়াতে আসেন মধ্যযুগের মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা কবি বিজয় গুপ্ত কিংবা স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল মিছিলে গলা ফাটানো চারণ কবি মুকুন্দ দাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে মুকুন্দ দাসের গান এই মাটির মানুষকে শিখিয়েছিল কীভাবে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে হয়। একটু দূরে তাকালে দেখি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত পুরুষকে—অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোর প্রস্তাবের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মানুষটি যখন বাঙালি জাতিকে প্রথম স্বাধিকারের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তখন তাঁর সেই দূরদর্শিতার শেকড়টি প্রোথিত ছিল এই বরিশালেরই পলিমাটিতে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে বুকটা কেঁপে ওঠে একাত্তরের রক্তস্নাত দিনগুলোতে। কীর্তনখোলার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ৩০ গোডাউন বধ্যভূমি কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের চত্বরে আজও যেন ভেসে বেড়ায় ৭ নম্বর সেক্টরের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ও ২ নম্বর সেক্টরের বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের বীরত্বের পদধ্বনি। ১৪ই ডিসেম্বরের বিজয়ের ঠিক প্রাক্কালে শহীদ হওয়া মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের রক্তে এই নদীমাতৃক মাটি আরও বেশি পবিত্র হয়েছে।

এই জনপদের বাতাসে মিশে আছেন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত, কবি কামিনী রায়, কিংবা সমাজ ও ধর্মের প্রচলিত সংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা লোকায়ত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর। আর প্রগতিশীল নারী জাগরণের অগ্রপথিক, জননী সাহসিকা সুফিয়া কামাল—তাঁদের সবার জীবন ও চিন্তার সমাহার ঘটেছে এই বরিশালের মাটিতেই।

শহরের প্রাণকেন্দ্রের বিবির পুকুরপাড় কিম্বা একটু দূরে উজিরপুরের সাতলার বিলে লাল শাপলার চাদর বিছানো রূপ কিংবা কুয়াকাটার সৈকত থেকে একই সঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার রোমাঞ্চ—এসবের চেয়েও বড় সত্য হলো এখানকার মানুষের মন। গৌরনদীর খাঁটি দই কিংবা মেঘনার ইলিশ দিয়ে অতিথিকে বরণ করে নেওয়ার যে সংস্কৃতি, তা কেবল আপ্যায়ন নয়, এক আত্মিক টান। এখানকার আঞ্চলিক ভাষার মিহি সুর—“মনু, ডাইলে লবণ দেছো না দেবা?”—বলতে শুনলে মনে হয় কোনো রক্তমাংসের মানুষ পরম স্নেহে আপনাকে নিজের ঘরের দাওয়ায় ডেকে নিয়েছে।

চন্দ্রদ্বীপের অতীত থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক রূপান্তর। এটি বঙ্গীয় সভ্যতা, সাহিত্য, রাজনীতি ও লোকায়ত জীবনের এক সংমিশ্রিত মহাকাব্য। নদী আর মানুষের এই যুগলবন্দি যতক্ষণ বহমান থাকবে, বরিশাল তার স্বকীয়তা ও ঐতিহ্যের মশাল নিয়ে বাংলা ও বাঙালির হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে যাবে।

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!