শিরোনাম:
Network News BD
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোর অস্তিত্ব সংকট ও আমাদের করণীয়

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ৯:১৯ AM ২৮ বার পঠিত
নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোর অস্তিত্ব সংকট ও আমাদের করণীয়

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি সম্পাদিত

মোছা. বৈশাখী খাতুন:

পৃথিবীতে কত শত সভ্যতা, জনবসতি গড়ে ওঠা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভূতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, সাহিত্য, কাহিনি ও পৌরাণিক উপাখ্যান, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমাজব্যবস্থা—সবকিছুরই উদ্ভব ও বিস্তৃতি লাভ করেছে নদীনালাকে ঘিরেই। জেগে উঠেছে মাটি, প্রকৃতি, সবুজের সমারোহ ও অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। প্রাণ পেয়েছে প্রতিটি গ্রাম, শহর বা উপশহর। সারা বিশ্বে অসংখ্য নদী শাখা-প্রশাখাসহ জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি দীর্ঘ প্রবাহ, যা কোনো উঁচু পাহাড় পর্বত হতে কোনো বড় জলাশয়ে (হ্রদ, সাগর বা মহাসাগর) গিয়ে মিশে যায়, আবার পুনরায় প্রবাহিত হয়। নদী কখনো শান্ত রূপ দেখায় আবার কখনো স্রোতের টানে নদীতীর ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

শিল্পবিপ্লবের পর থেকে নগরের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামগুলোও যত উন্নত হতে থাকল, ততই যেন নদীগুলোর নিজস্বতা হারিয়ে যেতে লাগল। একটা সময় নদীবিধৌত উর্বর পলিমাটি ছিল জীবন-জীবিকার অন্যতম সম্বল। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কৃষিকাজের সেচ প্রবাহ, মৎস্য পালন, উৎপাদন ব্যবস্থা, যোগাযোগ, যাতায়াত ব্যবস্থা, জলজ প্রাণীর অভয়ারণ্য, এমনকি অর্থনীতির প্রধান উৎস ছিল এই নদী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব দৃশ্য এখন অতীতের খাঁচায় বন্দী। বর্তমানে স্বাভাবিক চিত্র বদলে একেকটি নদী হয়ে পড়েছে প্রাণহীন, তারতম্য দেখা দিয়েছে স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতিতে।

আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, নদীগুলোকে আজ দখল-দূষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবমতে, বাংলাদেশের নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪১৫। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে শাখা-প্রশাখাসহ সংখ্যা ধরা হয়েছে প্রায় দুই হাজার। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, এ দেশে ৪০৫টি নদী রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে এসব নদীর সংখ্যা অনেকটাই কমে এসেছে। গত ৫০ বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। যার পেছনে ভূমিকা রাখছে এ দেশের অতিমাত্রায় ও নিয়ন্ত্রণহীন দখল-দূষণ।

বেশির ভাগ শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে নদীতীরবর্তী এলাকায়। কারখানার বর্জ্য পাইপলাইনগুলো সরাসরি নদী অভিমুখে সংযুক্ত করা হয়েছে। ডায়িং, বস্ত্র, রং ট্যানারি, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পের মতো প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা হতে নির্গত অপরিশোধিত তরল বা কঠিন বর্জ্য প্রতিদিন পানিতে গিয়ে মিশছে। শহর ও জনবসতি থেকে উৎপন্ন কয়েক টন গৃহস্থালি বর্জ্য ড্রেনেজ দিয়ে নদীতে অপসারিত হচ্ছে। নদীপথে চলাচলকারী জাহাজ ও নৌযান হতে ইঞ্জিনের পোড়া তেল, লুব্রিকেন্ট ও বর্জ্য পদার্থ নদীর পানিকে নিয়মিতভাবে দূষিত করে তুলছে। এ ছাড়াও প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য, কৃষিজমির রাসায়নিক পদার্থ, খনি হতে নিষ্কাশিত পদার্থ ও উজান হতে উৎপন্ন বর্জ্য নদীগুলোকে ময়লা-আবর্জনার একেকটি ভাগাড়ে পরিণত করেছে।

শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলের নদীগুলোরও একই অবস্থা। শুধু দূষণেই সীমাবদ্ধ নেই, নদীগুলো দখলেরও শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিল্প মালিকেরা অবৈধভাবে নদী দখল করে সেখানে কারখানা তৈরি করছেন। প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও ভূমিদস্যুরা নদী ভরাট করে তৈরি করছেন বড় বড় স্থাপনা। ঘন ঘন বালু উত্তোলন করে পানি ধারণক্ষমতা কমিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা নদীতীরবর্তী অঞ্চলে মাটি দিয়ে বেষ্টনী তৈরি করে নির্দিষ্ট সীমানা ঘেঁষে তৈরি করছেন বসতবাড়ি।

দখল-দূষণের অন্যতম শিকার রাজধানী ঢাকার তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা ও বালু নদী। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) এসব নদীকে অতিমাত্রায় দূষিত এবং ২০০৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর বাস্তুতান্ত্রিক সংকটপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে শহরের প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী। ঢাকা ওয়াসার এককভাবে তরল বর্জ্য অপসারণ ও শহরের অধিকাংশ অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক ট্যানারির ৪.৭৫ মিলিয়ন বিষাক্ত ও অপরিশোধিত তরল ও কঠিন বর্জ্য নদীকে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে পানির প্রকৃত রং হারিয়ে পুরোপুরি কালো ও এতটাই দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে যে এর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া দুরূহ।

২০২৩ সালের পানিসম্পদ পরিকল্পনা অনুযায়ী, গুরুতর দূষিত নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৬। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) মতে, ৪২৪টি নদী মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দূষিত নদীর তালিকায় রয়েছে গাজীপুরের লবণদহ, বংশী, সুতিয়া ও খিরু নদী, নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া, হবিগঞ্জের সুতাং, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, খুলনার ভৈরব নদীসহ আরও অনেক নদী। অন্যদিকে বরিশালের কীর্তনখোলা, নেত্রকোনার মগড়া, পটুয়াখালীর খাপড়াভাঙ্গা ও বৃহৎ ফেনী নদীসহ এরকম ছোট-বড় অসংখ্য নদী দখলদারদের কবলে।

এভাবে দিনের পর দিন এক দিকে মাত্রারিক্ত দূষণ তো অন্যদিকে দখলের ফলে নদীগুলোর নিজস্বতা হারিয়ে বদলে যাচ্ছে স্বাভাবিক গতিপথ। জলজ প্রাণী ভুগছে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন স্বল্পতায় (দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ৪.৫ থেকে ৮ মাত্রা) এবং জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। শিল্পকারখানার নির্গত নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, পারদ, সিসা, ক্রোমিয়াম নদীকে অ্যাসিডিক করে তুলছে। এতে বাস্তুসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে। বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশে পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। নদীর ওপর নির্মিত সড়ক ও সেতুগুলোর অবকাঠামো দুর্বল হয়ে জনগণের ভোগান্তি বেড়ে যাচ্ছে। দূষিত পানির ব্যবহারে কলেরা, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা এমনকি ক্যানসারের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে জনজীবন।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন অনুযায়ী, ২২৯টি নদী সংকটাপন্ন ও অন্তত ৮১টি মৃতপ্রায়। এর মধ্যে লালমনিরহাটের ১৪টি, খুলনার ৩৭টি, হবিগঞ্জের ৪৬টি অস্তিত্ব সংকটে। হারিয়ে যাচ্ছে তিতাস, বুড়িগঙ্গা, ভৈরব, সাঙ্গু, ইছামতী, তুরাগ, পুনর্ভবা ও হালদাসহ আরও অনেক নদী। দীর্ঘদিন যাবৎ এসব নদী খনন না করা এবং উৎসমুখে স্লুইসগেট না দেওয়ায় শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে।

এভাবে দীর্ঘমেয়াদে দখল বা দূষণ চলতে থাকলে ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নদীর পাড়গুলো পুনরায় সংস্কার ও ইজারা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। নদীর দখল-দূষণকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। সে ক্ষেত্রে সহজেই দখল ও দূষণকারীদের পর্যাপ্ত শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব। সবচেয়ে কার্যকরী ও সক্রিয় পদক্ষেপ হতে পারে নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ, সেই সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ।

মানবজাতির অগ্রগতি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সচল রাখা, সার্বিক উন্নয়ন, জনগণের জীবিকা রক্ষা, জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদীকে বিলীন হতে দেওয়া যাবে না। নদী বাঁচলে জনজীবন বাঁচবে। তাই নদী রক্ষার অঙ্গীকার হোক কথায় নয়, বাস্তবধর্মী ব্যবস্থাপনায়। ফিরে আসুক নদীমাতৃক বাংলার চিরচেনা প্রকৃতির রূপ।

 শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ইডেন মহিলা কলেজ।

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!