দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান আনন্দানুষ্ঠান। এই আনন্দানুষ্ঠানে সবাই আমোদ প্রমোদে মেতে ওঠে। বাংলার পাড়ায় পাড়ায় আনন্দধারা বইতে থাকে। পূজার কালে প্রতিটি হিন্দু বাঙালিই সাধ্যানুসারে দোকান থেকে পোশাক পরিচ্ছদ ও প্রসাধনসামগ্রী ক্রয় করে থাকেন। এ কারণে দুর্গাপূজার প্রায় এক দেড় মাস আগে থেকেই পোশাক পরিচ্ছদের দোকানে ভিড়ভাট্টা লেগে থাকে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে আমাদের দেশে সাধারণত এক মাস স্কুল কলেজ ছুটি থাকে। অফিস আদালতও এ সময় এক দুদিন ছুটি থাকে। তা ছাড়া যাঁরা দূরে বা বিদেশে থেকে চাকরি কিংবা লেখাপড়া করে থাকেন, তাঁরা পূজা উদ্যাপন করতে এ সময় নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন।
আমাদের দেশে সাধারণত শরৎ ও বসন্তকালে অর্থাৎ বছরে মোট দুবার দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হয়। শরৎকালের পূজাকে শারদীয় পূজা আর বসন্তকালের পূজাকে বাসন্তী পূজা বলে অভিহিত করা হয়। এ সময়ে শারদীয় পূজারই চলন বেশি। তবে এবার নিয়মের কিছুটা অন্যথা হয়েছে। শরতের আশ্বিনে নয়, দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে হেমন্তের কার্তিকে। দুর্গাপূজার বর্ণনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, দুর্গা তাঁর বাহন সিংহের ওপর দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর বাঁদিকে বীণা হাতে এক কন্যা সরস্বতী, ডানদিকে অন্য কন্যা লক্ষ্মী। সরস্বতীর বাঁদিকে তীর ধনুক হাতে এক পুত্র কার্তিক আর লক্ষ্মীর ডানদিকে আর এক পুত্র হস্তীমুখ গণেশকে দেখা যায়। এ ছাড়া দেবী দুর্গার পায়ের কাছে তিনি নিজ হাতে মহিষাসুরকে বধ করছেন এমন চিত্র দেখা যায়।
বাংলাদেশে সাধারণত পূজার দিনে হিন্দুধর্মের অনুসারীরা খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পূজার জন্য ফুল, বেলপাতা, তুলসী, দূর্বাসহ পুষ্পপত্র সাজিয়ে দেবী দুর্গার দুয়ারে গমন করেন। সবার আগে শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে ঘট বসিয়ে দুর্গাপূজার সূত্রপাত করা হয়। একেই বলে বোধন। এ দিনে দেবীর হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়, দেবীকে মণ্ডপে আহ্বান জানানো হয় এবং নানা রকম গয়না দ্বারা সজ্জিত করা হয়। অতঃপর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী এই চার দিন ধরে মহাসমারোহে পূজা উদ্যাপিত হয়।
সপ্তমীতে দেবীর চক্ষুদান দিয়ে পূজা শুরু হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দেবী এ দিনে চোখ মেলে নতুনভাবে ভক্তবৃন্দকে দেখেন। তাই ভক্তরা অধীর আগ্রহে দেবীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। অষ্টমীতে অঞ্জলি দেওয়া ও কুমারী পূজা করা হয়। এই দিন সন্ধ্যায় মানবকল্যাণে সন্ধ্যা আরতি করা হয়। এ সময়ে ধূপের মাতাল গন্ধ যেন চৈতন্য হারিয়ে দেয়। ঢাকের তালে দুহাতে ধুনচি নিয়ে মঙ্গল আরতিতে মেতে ওঠে সবাই। অষ্টমী আর নবমীর সন্ধিক্ষণে হয় সন্ধিপূজা। এ সময়ে মাটির ঢেলা দিয়ে মণ্ড বানিয়ে তৈরি করা হয় ১০৮টি প্রদীপ। বাহারি রকমের ফল কেনা হয় সেদিন। সন্ধ্যায় মণ্ডপে মণ্ডপে চলে দেবী দর্শন।
দশমীর রাতে প্রতিমাকে অর্থাৎ মাটি দিয়ে গড়া দেবমূর্তিকে নদী বা সাগরজলে বিসর্জন দেওয়া হয়। অবশ্য দেবী বিসর্জনের আগে দশমীতে দেবীবরণ চলে, সবাই মেতে ওঠে সিঁদুর খেলায়। আবির আর সিঁদুরে রাঙা হয় ভক্তদের ললাট, কপোল ও জামাকাপড়। মিষ্টিমুখে ধুনচি হাতে ঢাকের তালে তালে জলে নিমজ্জিত হয় দেবী প্রতিমা। অশ্রুসিক্ত হয় ভক্তবৃন্দের চোখ। তবে তারা আশায় বুক বাঁধে দেবী বছর ঘুরে আবার আসবেন। দেবী দুর্গার অপেক্ষায় এবং তাঁর মেয়ে দেবী লক্ষ্মীর আগমনী বার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার আয়োজনে। আনন্দে মেতে উঠবে সবাই, আশীর্বাদপুষ্ট হবে মানবজীবন।
এত কিছুর পরও মানবমনে একটা হাহাকার ওঠে। দেবী দুর্গাকে তাঁর ভক্তরা বলতে থাকে, ‘হে সকলের কল্যাণকারিণী, কৈশোরের আমোদ প্রমোদ, বাবার হাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, মা দিদি দিদার সঙ্গে জ্যোৎস্নারাতে শিউলি ফুল তোলা ফিরিয়ে দাও। ফিরিয়ে দাও মায়ের হাতের নাড়ু সন্দেশ খাওয়া আর পূজার দিনে বাড়িতে থেকে পূজা উদ্যাপন করা। সুস্থিরতার অমৃতধারা বর্ষণ করো মানুষের জীবনে।’
দেবী বিসর্জন শেষে ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে বা ভূমিতে আনত হয়ে অভিবাদন জানায়, যাকে প্রণাম বলা হয়। আর বড়রা পরস্পরকে আলিঙ্গন করেন, একে অন্যকে মিষ্টি খাওয়ান। অতঃপর পূজার ছুটি শেষ হতে না হতেই লেখাপড়ায় মন দিতে হয় শিশু কিশোর ও যুবকদের। স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খুললেই পরীক্ষার ঘণ্টা বেজে ওঠে। অন্যদিকে বড়দের অর্থাৎ কর্মজীবীদের ফিরে যেতে হয় নিজ নিজ কর্মস্থলে।
লেখক: কবি ও ছড়াকার
