পূজা শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সংবর্ধনা, সম্মান প্রদর্শন, শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, মহান দর্শন বা আদর্শ অনুসরণ। সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। দুর্গা মায়ের আগমনী ছন্দে ছন্দায়িত হয় ভক্তের তনুমন। দুর্গাপূজা মূলত শুভশক্তি আবাহনের পূজা। প্রবাদ আছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বারো মাসে তেরো পার্বণ। তবে প্রতিটি পূজা বা পার্বণের নির্দিষ্ট তিথি বা সময় আছে। তেমনি দুর্গাপূজাও একটি। তবে শারদীয় দুর্গাপূজা বর্তমানে সর্বজনীন রূপ লাভ করেছে। এই সর্বজনীন দুর্গাপূজাকে ঘিরে দেশ মহাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠেছে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধন।
আমাদের দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আশ্বিন মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি থেকে দশমী পর্যন্ত দেবী দুর্গার আরাধনা করে থাকেন। দেবী দুর্গা হলেন দুর্গতিনাশিনী অর্থাৎ সব দুঃখ দুর্দশার বিনাশকারী। পুরাকালে দেবতারা মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরীর থেকে আগুনের মতো তেজোরশ্মি একত্রিত হয়ে বিশাল আলোকপুঞ্জে পরিণত হয়। ওই আলোকপুঞ্জ থেকেই আবির্ভূত হলেন দেবী দুর্গা। দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত দেবী দুর্গা অসুরকুলকে বধ করে স্বর্গ তথা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি স্থাপন করেন। দেবী দুর্গা মহামায়া, মহাকালী, মহালক্ষ্মী, মহাসরস্বতী, শ্রীচণ্ডী প্রভৃতি নামেও পরিচিত। সর্বশক্তির আধার আদ্যশক্তি হলেন মা দুর্গা। দুর্গমাসুর নামক এক দৈত্যকে বধ করে তিনি দুর্গা নামে খ্যাত হন। মা দুর্গা শত্রুর কাছে বা পাপীর কাছে যেমন ভয়ংকর, তেমনি সন্তানের কাছে তিনি স্নেহময়ী। ঈশ্বরের মাতৃরূপের নাম হচ্ছে মা দুর্গা, দেবী মহামায়া।
দেবী দুর্গা ১০৮টি বিশেষণে ভূষিত হন। ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র অকালে ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে দেবীর পূজা করেছিলেন। বর্তমানে আমরা রামচন্দ্র অকালে দেবী দুর্গার বোধন করে যে পূজা করেছিলেন, সেটাই অনুসরণ করছি। রামচন্দ্র শরৎকালে যে দুর্গাপূজা করেন, সেটাকে বলা হয় অকালবোধন। নিদ্রিত সময়ে দেবতাদের জাগ্রত করাকেই বলা হয় অকালবোধন। রাবণের লঙ্কা থেকে প্রিয়তমা স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারের জন্য ত্রেতাযুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন। আর অন্য যে দুর্গাপূজাটি মূল পূজা ছিল, সেটা এখন বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। অসুরদের রাজা মহিষাসুরকে বধ করে দেবী দুর্গা হলেন মহিষাসুরমর্দিনী। তিনি আদ্যশক্তি মহামায়া। সব পাপ ও অন্যায় কাজের আধার অসুর নিধন করে দেবী দুর্গা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
পাপীর বিনাশে দেবী রণসাজে সজ্জিত হন বলে তিনি রণদেবী। পশুরাজ সিংহ দেবীর বাহন। সঙ্গে দুই পুত্র সেনাপতি কার্তিক ও সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং দুই মেয়ে ধনের দেবী লক্ষ্মী ও বিদ্যার দেবী সরস্বতী। দেবী দুর্গার চার সন্তানের সঙ্গে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ জড়িত। দেবী স্বামীগৃহ কৈলাস থেকে পিত্রালয় মর্ত্যে বেড়াতে আসেন প্রতিবছর আশ্বিন মাসের পঞ্চমী তিথিতে। দেবীর তিনটি চোখ বলে তাঁকে ত্রিনয়নী বলা হয়। দেবীর বাঁ চোখ চন্দ্র, ডান চোখ সূর্য এবং কপালের চোখ অগ্নিকে নির্দেশ করে। দেবী দুর্গার দশ হাতে দশটি অস্ত্র শক্তির প্রতীক। দেবীর ডান দিকের পাঁচ হাতের অস্ত্রগুলো হচ্ছে যথাক্রমে ত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, বাণ ও শক্তি। বাঁ দিকের পাঁচ হাতের অস্ত্রগুলো হচ্ছে ঢাল, ধনুক, পাশ, অঙ্কুশ ও কুঠার।
বিজয়ার দিনে মহিষাসুরকে বধের মাধ্যমে বিজয়ের উৎসব পালিত হয়। বিজয়া দশমী হলো ঐক্যের প্রতীক এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন। বিজয়ার দিনে অনেকেই পূর্বশত্রুতা ভুলে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হন এবং বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন। তাই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এমনকি বৈশ্বিক সংহতি রক্ষায় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় দুর্গাপূজার গুরুত্ব অনেক। ‘রাবণস্য বিনাশায় রামসানুগ্রহায় চ অকালে বোধিতা দেবী’। অর্থাৎ রাবণকে বিনাশের জন্য রামের প্রতি অনুগ্রহবশত অকালে দেবী দুর্গা বোধিত হয়েছিলেন। দুষ্টশক্তি রাবণকে বধ করার জন্য রাম নিদ্রিত সময়ে দেবীর পূজা করেছিলেন অকালবোধনের মাধ্যমে। ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।’ অর্থাৎ যে দেবী শক্তিরূপে সর্বজীবে বিরাজিতা তাঁকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার।
কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
