শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

হকার উচ্ছেদ: নগরের সৌন্দর্যের আড়ালে জীবিকার সংকট

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৫৫ PM ২৫ বার পঠিত
হকার উচ্ছেদ: নগরের সৌন্দর্যের আড়ালে জীবিকার সংকট

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি সম্পাদিত

অর্পা খন্দকার:

শহরকে পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন করার নামে ফুটপাত খালি হচ্ছে, আর সেই ফুটপাতের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের আয়ের শেষ অবলম্বন। উন্নত নগরের জন্য প্রশস্ত সড়ক, দখলমুক্ত ফুটপাত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের এই ছবির আড়ালে উচ্ছেদ হওয়া হকারের পরিবার যদি অনিশ্চয়তায় পড়ে, তবে নগরায়ণের সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান প্রয়োজনীয় হলেও কেবল উচ্ছেদ কোনো টেকসই নগরনীতি নয়। কারণ অবৈধ দখল নাগরিকের চলাচলের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, আবার বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত করে। তাই দখলমুক্ত ফুটপাত, নিরাপদ চলাচল এবং শ্রমজীবী মানুষের বৈধ কর্মপরিসরকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

উচ্ছেদ ও জীবিকার দ্বন্দ্ব
ঢাকা মহানগরীতে হকারের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার থেকে ছয় লাখের বেশি বলে বিভিন্ন সূত্র ও সংগঠনের তথ্যে উঠে এসেছে। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকায় প্রায় ৩৮৮ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে, যার প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার বা ৪০ শতাংশ হকারদের দখলে থাকে। এই পরিসংখ্যান সমস্যাটির দুই দিক স্পষ্ট করে। একদিকে বিপুল মানুষের জীবিকা ফুটপাতকেন্দ্রিক, অন্যদিকে নাগরিকের নিরাপদ চলাচলের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। ফলে সমাধান হতে হবে একই সঙ্গে মানবিক ও শৃঙ্খলাভিত্তিক।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনা কিংবা সিলেটের মতো শহরে ফুটপাত নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অনেক জায়গায় ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের সড়কে নেমে চলতে হয়। অস্থায়ী দোকান, পণ্যের স্তূপ ও ক্রেতাদের ভিড় চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও যানজট বাড়ায়। নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এবং নাগরিকের অধিকার।

অন্যদিকে ফুটপাতে বসা হকারদের সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। তাদের বড় একটি অংশ সীমিত পুঁজি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন। স্থায়ী দোকান ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় ফুটপাতই তাদের কর্মস্থলে পরিণত হয়েছে। দিনের বিক্রির ওপর নির্ভর করে চলে পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনা। ফলে হঠাৎ উচ্ছেদ শুধু ব্যবসার জায়গা হারানো নয়, পুরো পরিবারের আয় অনিশ্চিত করে দেয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে পরিচালিত অভিযান সমস্যার মানবিক দিককে উপেক্ষা করে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি
উচ্ছেদের আরেকটি বড় সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে অভিযান চালিয়ে একটি এলাকা খালি করা হলেও কিছুদিন পর একই জায়গায় আবার দোকান বসে। এর পেছনে জীবিকার তাগিদ, বিকল্প কর্মপরিসরের অভাব, দুর্বল তদারকি ও অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা কাজ করে। কোথাও অবৈধ দখলের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে। ক্ষুদ্র হকারকে সরিয়ে বড় দখলদারদের কার্যক্রম চলতে থাকলে আইন প্রয়োগের ন্যায়সংগত চরিত্র দুর্বল হয়।

হকাররা দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কম দামে পোশাক, খাবার, ফল, বই ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির মাধ্যমে তারা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দেন। তাই তাদের পুরোপুরি উচ্ছেদ না করে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনা অধিক বাস্তবসম্মত। একই সঙ্গে হকারদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। পথচারীর চলাচল বন্ধ করা, নির্ধারিত জায়গার বাইরে বসা, অতিরিক্ত জায়গা দখল এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মানার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

সমাধানের পথ ও টেকসই নগরনীতি
বাংলাদেশের বাস্তবতায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:

১. সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত হকারদের নিবন্ধন করতে হবে।
২. হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও ব্যস্ত সড়কের ফুটপাত সম্পূর্ণ দখলমুক্ত রাখতে হবে এবং তুলনামূলক কম ব্যস্ত এলাকায় পরিকল্পিত হকার জোন তৈরি করতে হবে।
৩. হকার জোনে দোকানের আকার, পণ্যের ধরন, ব্যবসার সময়, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম নির্ধারণ করে স্বল্পমূল্যের লাইসেন্স চালু করতে হবে।
৪. উচ্ছেদের আগে পর্যাপ্ত নোটিশ ও বিকল্প স্থান নিশ্চিত করতে হবে এবং পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মপরিসরকে উচ্ছেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
৫. অবৈধ পার্কিং, দোকানের বর্ধিত অংশ, স্থায়ী অবৈধ স্থাপনা এবং প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও হকার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্থায়ী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৭. বিকল্প পেশায় যেতে আগ্রহী হকারদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, স্বল্প সুদে ক্ষুদ্রঋণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

নগরের সৌন্দর্য, নিরাপদ চলাচল ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নাগরিকের অধিকার। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার নিরাপত্তাও মানবিক নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই হকার সমস্যার সমাধান শুধু উচ্ছেদ অভিযানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সরকার ও নগর কর্তৃপক্ষকে উচ্ছেদকেন্দ্রিক সাময়িক পদক্ষেপ থেকে সরে এসে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট হকার জোন, পুনর্বাসন, স্বচ্ছ লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকির সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করতে হবে। নগরের সৌন্দর্য তখনই টেকসই হবে, যখন পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ও মর্যাদাও সুরক্ষিত থাকবে। এ জন্য উচ্ছেদকে লক্ষ্য নয়, সুশৃঙ্খল পুনর্বাসন ও কর্মপরিসরকে লক্ষ্য করতে হবে।

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!