পাঠদান বা জ্ঞানের আদান-প্রদান মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। তাই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে মনের সংযোজন না হলে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন সম্ভব হয় না। শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষকের আচরণ ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবহারের উপর শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, আগ্রহ ও শেখার ইচ্ছা নির্ভর করে। এ কারণেই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের নিরপেক্ষ আচরণ সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষকের প্রিয় কিছু শিক্ষার্থী থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক যদি শ্রেণিকক্ষে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতেই ক্রমাগত প্রকাশ পেতেই থাকে তাহলে বাকি শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবহেলিত মনে করতে শুরু করে। নিজের আলাদা ভাবে, শিক্ষক তাদের প্রতি মনোযোগ দেন না মর্মে ভাবতে থাকে, প্রান্তিক শিক্ষার্থীতে পরিণত হয়। এই অনুভূতির ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে, প্রশ্ন করতে কিংবা নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে সংকোচ বোধ করে। তখন শিক্ষকের ভালো পরামর্শও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়, যা শিক্ষার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থী যদি মনে করে সে অবহেলিত, তখন সে পড়াশোনা ও অন্যান্য নিয়মিত কার্যাবলী থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় অনেক শিক্ষকই শিক্ষার্থীর আত্মীয় বা পারিবারিক পরিচিত হন। শ্রেণিকক্ষে যদি লাগাতার সেই সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, তাহলে বাকিদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ জন্মায়। অন্যদিকে সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা নিজেদের আলাদা ও প্রভাবশালী মনে করতে শুরু করে। কখনো কখনো তারা সেই সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অনৈতিক কাজে জড়ায়, ক্ষেত্রবিশেষে অন্যদের উপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টাও করে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বই সুষ্ঠু শিক্ষার অন্যতম প্রধান বাঁধা।
এর সমাধান একজন শিক্ষকের সচেতন ও নিরপেক্ষ আচরণের মাধ্যমেই সম্ভব। খুব সাধারণভাবেই প্রিয় শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সাথে সম্পর্ককে উপভোগ করবে এবং সব সময় শিক্ষকের সান্নিধ্য পেতে চাইবে। তাদের এই চাওয়াকে উপেক্ষা করে একজন শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব এবং সফলতা হলো শ্রেণিকক্ষে সবার কাছে নিজেকে সমানভাবে তুলে ধরতে পারা। সবার প্রশ্ন ও মতামতকে উৎসাহ দেওয়া, ব্যক্তিগত সম্পর্ককে শ্রেণিকক্ষের বাইরে সীমাবদ্ধ রাখা। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষক কখনোই এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন না, যাতে কোনো শিক্ষার্থী নিজেকে অবহেলিত মনে করে। শিক্ষকের নিরপেক্ষতা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়, এটি সুষ্ঠু, সমতাভিত্তিক ও কার্যকর শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান শর্ত।
লেখক: শিক্ষার্থী ও সংগঠক।
