‘তুমি এত রাগ করো কেন?’, ‘এত সামান্য বিষয় নিয়ে এত কান্নাকাটি?’, ‘এসব করে কি সবার মনোযোগ চাও?’ আমাদের সমাজে এমন মন্তব্য যেন খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণদের আবেগের ওঠানামাকে আমরা প্রায়ই নাটক, অতিরিক্ত আবেগ কিংবা মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা বলে উড়িয়ে দিই। অথচ একজন মানুষের ভেতরের জগৎ বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই জটিল। অনেক সময় মানুষ তার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, তাই আচরণই হয়ে ওঠে তার অনুভূতির ভাষা। সে কারণেই মুড সুইংকে সব সময় মনোযোগ পাওয়ার কৌশল হিসেবে দেখার প্রবণতা কেবল ভুলই নয়, অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকরও।
মুড সুইং বলতে অল্প সময়ের ব্যবধানে একজন মানুষের আবেগ বা মানসিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তনকে বোঝায়। একজন মানুষ কিছুক্ষণ আগেও স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত কিংবা হাসিখুশি থাকতে পারেন, আবার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দুঃখ, রাগ, হতাশা, অস্থিরতা বা কান্নায় ভেঙে পড়তে পারেন। অনেক সময় আশপাশের খুব সাধারণ ঘটনাও তার কাছে অসহনীয় মনে হয়। অবশ্যই জীবনের নানা পরিস্থিতিতে সবারই মন খারাপ হয়, রাগ হয় কিংবা হতাশ লাগে। কিন্তু যখন এই পরিবর্তন ঘন ঘন ঘটতে থাকে, দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং পড়াশোনা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি আর সাধারণ আবেগের ওঠানামা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না।
বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনযাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি চাপপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার ফল, ভর্তি প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়। একজন চাকরিজীবীকে কাজের চাপ, কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে লড়তে হয়। পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, একাকীত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা; এসবই মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। অনেক সময় মানুষ বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে থাকেন। সেই ভাঙনের প্রথম দিকের লক্ষণগুলোর একটি হতে পারে ঘন ঘন মুড পরিবর্তন।
প্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি নতুন ধরনের মানসিক চাপও সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিন অন্যের সাফল্য, সুখী জীবনের ছবি কিংবা সাজানো বাস্তবতা দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করেন। অজান্তেই অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করতে করতে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, বাড়তে থাকে হতাশা। অনলাইন হয়রানি, নেতিবাচক মন্তব্য কিংবা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটানোর অভ্যাসও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে মুড সুইং আগের তুলনায় আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বলছে, দেশের ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী প্রায় ১৬.৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এই হার প্রায় ১৩.৬ শতাংশ। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের নীরব সংগ্রাম। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা পরামর্শ গ্রহণ করেন না। অনেকেই লজ্জায়, অনেকেই সামাজিক কুসংস্কারের ভয়ে, আবার কেউ কেউ সমস্যাটিকেই সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতে চান না।
আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো নানা ভুল ধারণা প্রচলিত। কেউ যদি বারবার মন খারাপ করে, সহজেই কেঁদে ফেলে কিংবা আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়, তাহলে তাকে দুর্বল, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ কিংবা মনোযোগপ্রার্থী বলে আখ্যা দেওয়া হয়। অথচ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, অনেক মানুষ ইচ্ছা করেও নিজের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। তাই তাদের আচরণই হয়ে ওঠে সাহায্যের আবেদন। এই আবেদনকে উপহাস করলে বা গুরুত্ব না দিলে তারা আরও গুটিয়ে যান, আরও একাকী হয়ে পড়েন। একসময় সেই একাকীত্ব উদ্বেগ, বিষণ্নতা কিংবা আরও জটিল মানসিক সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আমরা প্রায়ই মানুষের শারীরিক অসুস্থতার খোঁজ নিই, কিন্তু মানসিক অবস্থার খবর নিতে ভুলে যাই। কারও জ্বর হলে তাকে বিশ্রাম নিতে বলি, চিকিৎসকের কাছে যেতে বলি। কিন্তু কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকেন, তখন তাকে বলা হয়, ‘এত ভাবছ কেন?’, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’ এসব কথা অনেক সময় সদিচ্ছা থেকে বলা হলেও এগুলো সবসময় কার্যকর হয় না। অনেক সময় একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় এমন একজন শ্রোতার, যিনি বিচার করবেন না, কেবল মন দিয়ে তার কথা শুনবেন।
পরিবার, বন্ধু, সহপাঠী কিংবা সহকর্মীদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারও আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা গেলে তাকে দোষারোপ করার আগে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। আমরা যদি বিচার করার বদলে শুনতে শিখি, উপদেশ দেওয়ার আগে বুঝতে শিখি, তাহলে অনেক মানুষ সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবে। প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াকে যেমন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে হবে, তেমনি পরিবারকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।
এর পাশাপাশি নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সচেতন হওয়া জরুরি। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক ব্যায়াম, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংযম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের স্বাস্থ্যকর উপায় অনুশীলন একজন মানুষকে মানসিকভাবে অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকতে সাহায্য করতে পারে। তবে এসব অভ্যাস কোনো চিকিৎসার বিকল্প নয়; সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়, মানুষের প্রতি তার সহমর্মিতাতেও প্রকাশ পায়। আমরা যদি মানুষের কান্নাকে দুর্বলতা, রাগকে অভদ্রতা কিংবা মুড সুইংকে কেবল মনোযোগ আকর্ষণের কৌশল হিসেবে দেখি, তাহলে হয়তো এমন অনেক মানুষকে হারিয়ে ফেলব, যাদের প্রয়োজন ছিল শুধু একটু বোঝাপড়া, একটু সময় এবং সহানুভূতি।
লেখক: মিফতাহুল জান্নাত মৌমিতা, শিক্ষার্থী (দর্শন বিভাগ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
