ইসলাম কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের সমষ্টি নয়, বরং এটি মানুষের জন্য একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। একজন প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য যেমন নামাজ, রোজা, হজ বা জাকাত আদায়ের প্রয়োজন রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে প্রয়োজন উত্তম চরিত্র ও মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছিলেন মানবজাতির মাঝে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য। তাঁর গোটা জীবনই হলো পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য সবচেয়ে সুন্দর ও নিখুঁত আদর্শ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.) এর চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন যে, তিনি অবশ্যই এক মহান চরিত্রের অধিকারী। মক্কার কাফিররা যখন তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল, তখনও তিনি তাদের সাথে কোনো ধরনের রূঢ় বা খারাপ আচরণ করেননি। বরং তিনি সবসময় মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন এবং শত্রু ও মিত্র সবার সাথেই ন্যায়বিচার করতেন। একজন সত্যিকারের মুসলমানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তার কথা ও কাজের দ্বারা অন্য কোনো মানুষ কখনো কষ্ট পাবে না।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুন্দর আচরণের প্রভাব অপরিসীম। একটি শান্তিময় সুন্দর সমাজ গঠনে পারস্পরিক সম্মানবোধ, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার কোনো বিকল্প নেই। ইসলামে হাসিমুখে কথা বলাকেও সদকা বা পুণ্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আপনি যখন কারও সাথে দেখা হলে আগে সালাম দেবেন এবং হাসিমুখে কুশল বিনিময় করবেন, তখন নিজের অজান্তেই আপনার আমলনামায় নেকি লেখা হতে থাকে। সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ের যে দূরত্ব থাকে, তা খুব সহজেই মুছে ফেলা সম্ভব। অহংকার, গিবত বা অপরের দোষ খুঁজে বেড়ানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ এসব বদভ্যাস মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এবং সমাজের শান্তি নষ্ট করে।
আখিরাতের জীবনেও উত্তম চরিত্রের পুরস্কার অনেক বড়। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন মুমিনের আমলনামার পাল্লায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী আর কোনো আমল হবে না। এমনকি একজন মানুষ কেবল তার সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে সেই ব্যক্তির সমান মর্যাদা অর্জন করতে পারে, যে ব্যক্তি সারা বছর নফল রোজা রাখে এবং সারা রাত জেগে নফল নামাজ আদায় করে। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তারা, যাদের চরিত্র ও ব্যবহার সবচেয়ে সুন্দর এবং যারা মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।
বর্তমান সময়ের যান্ত্রিক জীবনে আমরা অনেক সময়ই কাছের মানুষদের সাথেও রূঢ় আচরণ করে ফেলি। সামান্য কারণেই আমরা হয়তো ধৈর্য হারিয়ে তীব্র রাগ প্রকাশ করি। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া একজন মুমিনের অন্যতম বড় গুণ। যখনই কোনো কারণে রাগ আসবে, তখন রাসূল (সা.) এর সেই ক্ষমার আদর্শ আমাদের স্মরণ করতে হবে।
আমাদের সবার উচিত দৈনন্দিন জীবনে সুন্দর চরিত্র গঠনের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া। পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী এমনকি রাস্তাঘাটে অপরিচিত মানুষের সাথেও আমাদের আচরণ হতে হবে বিনয়ী ও শালীন। এর ফলে যেমন পৃথিবীতে আমাদের জীবন শান্তিময় হবে, তেমনি পরকালেও আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত লাভে ধন্য হব।
