স্মার্টফোনের এক ক্লিকে আজ সব উত্তর মেলে। কিন্তু যখন গুগল বা উইকিপিডিয়া ছিল না, তখন মানুষের জ্ঞান অন্বেষণের যাত্রা কেমন ছিল?
নব্বই দশকের শেষ দিকের কোনো এক বৃষ্টিমুখর বিকেলের কথা ভাবুন। বন্ধুদের আড্ডায় হঠাৎ তর্ক বাধল মাউন্ট এভারেস্টের সঠিক উচ্চতা বা মাদাগাস্কারের রাজধানী নিয়ে। বর্তমান সময়ে এমন তর্কের আয়ু বড়জোর পাঁচ সেকেন্ড। পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে গুগলে ছোট্ট একটি খোঁজ, আর সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর হাজির। কিন্তু সেই সময়ে এমন একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর জানাও এত সহজ ছিল না। কোনো কিছু জানার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য মানুষকে রীতিমতো কাঠখড় পোড়াতে হতো। তথ্য পাওয়ার সেই যাত্রাটি ছিল দীর্ঘ। তবে তার মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দ লুকিয়ে ছিল।
গুগল আসার আগে মানুষের জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে বড় জানালা ছিল বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়া। যাঁদের সামর্থ্য ছিল, তাঁদের বসার ঘরের বুকশেলফে শোভা পেত এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বা বাংলা শিশু বিশ্বকোষের ভারী খণ্ডগুলো। কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জানতে হলে বর্ণমালার ক্রমানুসারে সাজানো বিশাল সেই বইয়ের পাতা উল্টাতে হতো। পুরোনো কাগজের ঘ্রাণ নিতে নিতে একটি নির্দিষ্ট বিষয় খুঁজতে গিয়ে হয়তো সম্পূর্ণ অজানা এবং আকর্ষণীয় অন্য একটি বিষয়ের ওপর চোখ আটকে যেত। একটি শব্দের অর্থ খুঁজতে গিয়ে মানুষ শিখে ফেলত আরও পাঁচটি নতুন শব্দ। সার্চ ইঞ্জিনের সুনির্দিষ্ট অ্যালগরিদম আজ আমাদের হয়তো কাঙ্ক্ষিত তথ্যটি দ্রুত দেয়। কিন্তু বইয়ের পাতা উল্টানোর সময় সেই হঠাৎ পাওয়া নতুন জ্ঞানের রোমাঞ্চ এখন আর নেই।
শিক্ষার্থী, গবেষক বা বইপ্রেমীদের জন্য তখনকার দিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল ছিল পাবলিক লাইব্রেরি। শাহবাগের কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি, ব্রিটিশ কাউন্সিল বা পাড়ার ছোট পাঠাগারগুলো সব সময় মুখর থাকত জ্ঞানপিপাসুদের পদচারণায়। মজার ব্যাপার হলো, সেই আমলের সবচেয়ে শক্তিশালী সার্চ ইঞ্জিন ছিলেন লাইব্রেরিয়ানরা। একজন দক্ষ লাইব্রেরিয়ান খুব ভালো করেই জানতেন কোন তাকের কোন সারিতে আপনার কাঙ্ক্ষিত বইটি লুকিয়ে আছে। আজকের দিনের এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশনের জায়গাটি তখন দখল করে রেখেছিল কার্ড ক্যাটালগ সিস্টেম। ছোট ছোট ড্রয়ারের ভেতর সাজানো ইনডেক্স কার্ড ঘেঁটে দরকারি বইটির কল নম্বর একটি ছোট কাগজে টুকে নিতে হতো। এরপর শুরু হতো আসল খোঁজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়ে প্রয়োজনীয় অংশটুকু ডায়েরিতে লিখে নেওয়ার সেই অভ্যাসের মধ্যে এক ধরনের সাধনা ছিল। আর খুব জরুরি কোনো পাতার প্রয়োজন হলে ফটোকপির দোকানের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজার পদ্ধতিও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। হঠাৎ বাড়িতে প্লাম্বার দরকার অথবা দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয়ের ফোন নম্বর প্রয়োজন। তখন তো আর গুগল ম্যাপস বা লোকাল সার্চের সুবিধা ছিল না। মানুষের ভরসা ছিল ইয়েলো পেজেস বা ভারী টেলিফোন ডিরেক্টরি। ছোট ছোট অক্ষরে ছাপা হাজারো নামের তালিকা থেকে আঙুল বুলিয়ে নির্দিষ্ট নম্বরটি খুঁজে বের করা ছিল রীতিমতো ধৈর্যের পরীক্ষা। আর কোনো নতুন ঠিকানায় যাওয়ার জন্য মানুষের সবচেয়ে বড় দিকনির্দেশক ছিল রাস্তার ধারের চায়ের দোকানদার বা মোড়ের রিকশাচালক। বিয়ের দাওয়াত বা নতুন কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে কাগজে কলমে নিখুঁত ম্যাপ এঁকে দেওয়ার চল ছিল ব্যাপকভাবে। অচেনা মানুষকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করার মাধ্যমে সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হতো, প্রযুক্তি আজ তা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সাধারণ স্বাস্থ্যগত সমস্যার সমাধানের উপায়ও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। আজ একটু জ্বর বা কাশি হলেই আমরা ইন্টারনেটে লক্ষণ লিখে রোগ খোঁজার চেষ্টা করি। তখন ভরসা ছিলেন পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা বা পারিবারিক চিকিৎসক। ঠাকুমা দিদিমাদের টোটকা বা বাস্তব অভিজ্ঞতাই ছিল সেকালের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশ্বস্ত তথ্যভাণ্ডার। অন্যদিকে নতুন কোনো পদ রান্নার জন্য ইউটিউবের ভিডিও ছিল না। গৃহিণীদের ভরসা করতে হতো সিদ্দিকা কবীরের রান্নার বইয়ের ওপর অথবা প্রতিবেশীর কাছ থেকে লিখে নেওয়া রেসিপির ডায়েরির ওপর।
দেশ বিদেশের খবর, আবহাওয়া বার্তা বা সমসাময়িক যেকোনো বিষয়ের জন্য মানুষকে নির্ভর করতে হতো খবরের কাগজ, টেলিভিশন সংবাদ বা রেডিওর বুলেটিনের ওপর। বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার শর্টওয়েভ রেডিও সম্প্রচার শোনার জন্য মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে কান পেতে থাকত। সকালে পত্রিকাওয়ালা কাগজ দিয়ে যাওয়ার পর প্রতিটি পাতা খুঁটিয়ে পড়ার অভ্যাস ছিল প্রায় প্রতিটি শিক্ষিত পরিবারের রুটিন। কোনো দরকারি প্রবন্ধ বা তথ্য পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য মানুষ পত্রিকা থেকে কেটে সযত্নে ফাইলে জমিয়ে রাখত। সেটিই ছিল সেই সময়ের বাস্তব বুকমার্কিং। দূরে থাকা আপনজনের কোনো খবর নেওয়ার জন্য ভরসা ছিল ডাকঘর। একটি চিঠির উত্তরের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হতো, যা মানুষকে ধৈর্যশীল হতে শেখাত।
তথ্য জোগাড় করার এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রচুর সময় এবং শ্রম ব্যয় হতো। সহজে পাওয়া যেত না বলেই হয়তো মানুষ যেকোনো তথ্য অনেক বেশি দিন মনে রাখতে পারত। বন্ধু বান্ধব বা আত্মীয়স্বজনদের ডজনখানেক ল্যান্ডলাইন নম্বর মানুষের মুখস্থ থাকত। মানুষের মস্তিষ্ককে তখন অনেক বেশি সচল থাকতে হতো। দিনের পর দিন খোঁজার পর যখন কোনো কঠিন প্রশ্নের উত্তর মিলে যেত, তখনকার সেই প্রাপ্তির আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আজ আমাদের চারপাশে তথ্যের ছড়াছড়ি। খুব সহজে এবং বিনা পরিশ্রমে পাওয়া যায় বলে তথ্যের প্রতি আমাদের সেই আগের মতো গভীর কদর আর নেই।
গুগল এবং ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে অকল্পনীয় রকম সহজ করে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পুরো বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার এখন সত্যিই আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু গুগল আসার আগের যুগে তথ্য খোঁজার সেই ধীরগতির, রোমান্টিক এবং ধৈর্যশীল যাত্রার আলাদা একটি মাধুর্য ছিল। আমরা আজ অভাবনীয় গতি পেয়েছি ঠিকই। কিন্তু হয়তো হারিয়ে ফেলেছি জ্ঞান অন্বেষণের সেই গভীর তৃপ্তিটুকু। তথ্য এখন অনেকটা ফাস্ট ফুডের মতো দ্রুত পাওয়া যায়। তবে একসময় এটি ছিল অনেক সময় নিয়ে পরম যত্নে তৈরি করা সুস্বাদু আহারের মতো, যার স্বাদ মানুষের মনে রয়ে যেত বহুকাল।
