আফিয়া মোবাশসিরা ঐশী:
শহর মানেই ব্যস্ততা ও কোলাহল। চারদিকে মানুষের ছুটে চলার সঙ্গে যানবাহনের অবিরাম যাতায়াত। মানুষ প্রতিদিন ছুটে চলেছে নিজ প্রয়োজনে গন্তব্যের দিকে। কর্মজীবী মানুষ ছুটে চলেছেন কর্মস্থলে, শিক্ষার্থীরা যাচ্ছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ব্যস্ত শহরগুলোতে সড়ক ও যাতায়াত মাধ্যমগুলো মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরায় একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন এই চলার পথেই লুকিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী বিপদ, যা সামান্য অসতর্কতায় কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবন। এই বিপদগুলোর মধ্যে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে খোলা ও ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল।
ম্যানহোল মূলত বড় শহরগুলোর রাস্তা বা ফুটপাতের নিচে তৈরি করা একটি প্রবেশপথ, যার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পয়োনিষ্কাশন, ড্রেনেজ ও বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইন পরিদর্শন করা হয়। সেই সঙ্গে পরিষ্কার ও মেরামতের কাজও করা হয়। বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক শহরেই ম্যানহোলের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তবে এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে তা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ম্যানহোলের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের ম্যানহোলের ঝুঁকি ও এ সংক্রান্ত মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জের মতো জনবহুল শহরগুলো।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে ম্যানহোলের ঝুঁকির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চলতি ২০২৬ সালেও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে খোলা ম্যানহোল ও অরক্ষিত নালায় পড়ে প্রাণহানির বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত ২১ জুন গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায় ভারী বৃষ্টির পর পানিতে তলিয়ে থাকা একটি অরক্ষিত ড্রেনে পড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে ২৫ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর ১০ এর সেনপাড়া এলাকায় ম্যানহোলের কাজ করার সময় গাড়িচাপায় ওয়াসার এক কর্মীর মৃত্যু হয়। আবার চলতি বছরের আগস্টে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ধানমন্ডি, মিরপুর ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে যায়। এতে যান চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে অরক্ষিত ম্যানহোলগুলোর অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে পথচারী ও যানবাহন চলাচল হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। বিগত বছরগুলোর তথ্য পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে ম্যানহোলসংক্রান্ত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ২৯, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এসব প্রাণহানির পেছনে মূলত দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলাই দায়ী। নিয়মিত পরিদর্শন না করা এবং অরক্ষিত ম্যানহোলে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকার কারণেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে সমস্যাটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রথমত, কোনো ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেলে বা চুরি হয়ে গেলে সেখানে দ্রুত বিপদসংকেত বা ব্যারিকেড স্থাপন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ম্যানহোলে মূলত লোহার ঢাকনা ব্যবহার করা হয় যা ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করা যায়। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি বা চোরচক্র তাদের প্রয়োজনে ঢাকনাগুলো চুরি করে বিক্রি করে দেয়, ফলে ম্যানহোলগুলো অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। তাই ম্যানহোলের ঢাকনা হিসেবে ভাঙারি মূল্যহীন উপকরণ যেমন হিংড ডাকটাইল আয়রন, লকিং সিস্টেমযুক্ত আরসিসি বা ফাইবার রিইনফোর্সড প্লাস্টিক ব্যবহার করতে হবে।
তৃতীয়ত, স্মার্ট সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে যেন ম্যানহোলের ঢাকনা সরে গেলে বা চুরি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণকক্ষে বার্তা পৌঁছায়।
চতুর্থত, বর্ষা মৌসুমের আগে নিয়মিত ম্যানহোল অডিট বা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়।
পঞ্চমত, ম্যানহোলগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করার পাশাপাশি সেগুলোর আশপাশের অবস্থা তদারকি করতে হবে এবং আইন ও প্রশাসনিক নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।
ষষ্ঠত, জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। কোথাও কোনো অরক্ষিত ম্যানহোল দেখলে তা এড়িয়ে না গিয়ে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। অরক্ষিত এসব ম্যানহোলের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা, তাই তাদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। সেই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
একটি উন্নয়নশীল দেশ বলতে শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা আধুনিক অবকাঠামো বোঝায় না, বরং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। একটি দেশ তখনই প্রকৃত উন্নতির দিকে ধাবিত হয়, যখন সেই দেশের নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। অরক্ষিত ম্যানহোলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গড়ে উঠুক একটি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী।
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
