নাসরিন আক্তার:
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে মানুষের অত্যধিক চাপের কারণে ঢাকাসহ প্রধান প্রধান শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত বসতি ও বস্তি এলাকা। রাজধানী ঢাকার মতো মেগাসিটিতে আজ খোলামেলা পরিবেশ কিংবা পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। নগরজুড়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অপরিষ্কার পরিবেশের কারণে দূষণ দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। আর এই পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার সরাসরি সুফল ভোগ করছে মশার দল।
প্রতিনিয়তই বাড়ছে মশার মারাত্মক উপদ্রব। আমাদের দেশে বর্তমানে মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু ভয়াবহ চিত্রে পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় এবং করুণ উদাহরণ হলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষের অকালমৃত্যু। ডেঙ্গু আজ আর কেবল একটি সাধারণ মৌসুমি রোগ নয়, বরং এটি পুরো জাতি ও নগরবাসীর জন্য এক গভীর আতঙ্কের নাম।
ডেঙ্গু ও মশার উপদ্রব থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে আমাদের দেশে বছরের পর বছর ধরে একটি দৃশ্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানো বা ধোঁয়া দেওয়া। সাধারণ মানুষ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনেকেই হয়তো ভাবেন, ফগার মেশিনের ধোঁয়া দিলেই মশার উপদ্রব একবারে কমে যাবে। সারাদিনের যান্ত্রিক কোলাহল, ধুলাবালি এবং ক্লান্তিকর কর্মব্যস্ততা শেষে মানুষ যখন সন্ধ্যায় বাসায় ফেরে, তখন এলাকায় ফগার মেশিনের ধোঁয়া দেওয়া হচ্ছে দেখলে মনে একধরনের মানসিক শান্তি চলে আসে। মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভেবে নেয় যাক, আজকের মতো হয়তো মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া গেল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সাময়িক স্বস্তি পুরোপুরি একটি বিভ্রম বা মানসিক সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আধুনিক কীটতত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকেও এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে ফগার মেশিনের ধোঁয়ায় মশা পুরোপুরি মরে না বা মশার বংশবৃদ্ধি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয় না। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, কীটনাশকের মাত্রা যথাযথ না হলে কিংবা একটানা একই ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করলে মশার মধ্যে সেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা রেজিস্ট্যান্স গড়ে ওঠে। ফলে কিছুদিন পর সেই বিষাক্ত ধোঁয়াতেও মশা আর মরে না।
ফগার মেশিনের মাধ্যমে মূলত বাতাসে ভাসমান উড়ন্ত এবং বয়স্ক মশাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ধোঁয়া দেওয়ার পর সেই ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা কিছু উড়ন্ত মশা তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায় বা বিষাক্ত ধোঁয়ার তাড়নায় সাময়িকভাবে দূরে পালিয়ে যায়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি মশার মূল উৎস অর্থাৎ তাদের প্রজননক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। তা ছাড়া বাতাস বা আবহাওয়ার আর্দ্রতার কারণে এই ধোঁয়া খুব দ্রুত বাতাসে মিলিয়ে যায়, যার দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকারিতা থাকে না।
আমরা জানি এডিসসহ অন্যান্য মশা মূলত জমে থাকা পরিষ্কার বা ঘোলা পানিতে ডিম পাড়ে। বাসাবাড়ির ফুলের টব, ছাদে বা বারান্দায় জমে থাকা পানি, ড্রেন, ড্রাম, ফেলে দেওয়া ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা গর্তের পানিতে মশার অসংখ্য ডিম ও লার্ভা লুকানো থাকে। ফগার মেশিনের ধোঁয়া পানির উপরিভাগ ভেদ করে বা ঘরের কোনায় লুকিয়ে থাকা পানির ভেতরের লার্ভা পর্যন্ত পৌঁছাতে একদমই সক্ষম নয়।
ফগার ছিটানোর পর সাময়িকভাবে হয়তো মনে হয় এলাকা মশাহীন হয়ে গেছে। কিন্তু মাত্র দুই তিন দিন যেতে না যেতেই সেই টব, ড্রেন বা গর্তের পানিতে বেঁচে থাকা লার্ভাগুলো পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়। ফলে দ্বিগুণ উৎসাহে নতুন করে বংশবিস্তার ঘটে এবং মশার উপদ্রব আগের চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ ফগার মেশিন দিয়ে যা করা হচ্ছে তা হলো গাছের পাতা ছাঁটা, কিন্তু গোড়া থেকে শিকড় না কাটা।
শুধুমাত্র ফগার মেশিনের ধোঁয়ার ওপর নির্ভর করে কখনোই কোনো মেগাসিটিকে ডেঙ্গুমুক্ত করা সম্ভব নয়। অধিকন্তু ফগার মেশিনের অতিরিক্ত রাসায়নিক ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়ায় এবং শিশু ও অ্যাজমা রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং মশার বংশবৃদ্ধি স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে দরকার বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ।
প্রথমত লার্ভিসাইডিং জোরদার করা প্রয়োজন। মশার প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করে পানিতে লার্ভা ধ্বংসকারী নির্দিষ্ট কীটনাশক বা লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে। মশা ডিম থেকে ফুটে বের হওয়ার আগেই তা ধ্বংস করাই হলো সবচেয়ে কার্যকর উপায়। দ্বিতীয়ত জমে থাকা পানি অপসারণ করতে হবে। তিন দিনে এক দিন জমানো পানি ফেলে দিন এই নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। তৃতীয়ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। যেখানে সেখানে আবর্জনা ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং ড্রেনেজ সচল রাখতে হবে যেন কোথাও পানি জমে না থাকে। চতুর্থত জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কেবল সিটি করপোরেশনের মুখাপেক্ষী না হয়ে প্রতিটি নাগরিককে নিজের আঙিনা ও চারপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিটি এলাকায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ফগার মেশিনের বিষাক্ত ধোঁয়া সাময়িক এক মানসিক স্বস্তি দিলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মশার বংশবৃদ্ধির মূল উৎসে আঘাত না করে কেবল বাতাসে ধোঁয়া ওড়ালে কোটি কোটি টাকার অপচয় হবে ঠিকই, কিন্তু ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে নিস্তার মিলবে না। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে লার্ভা ধ্বংস করা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলাই হতে পারে ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র কার্যকর ও টেকসই পথ।
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ।
