শিরোনাম:
Network News BD
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

শহরের বর্জ্য: ব্যবস্থাপনার আড়ালে দায়হীনতা

মুহিবুল হাসান রাফি

প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২:৫১ PM ৩০ বার পঠিত
শহরের বর্জ্য: ব্যবস্থাপনার আড়ালে দায়হীনতা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি সম্পাদিত

শহর পরিষ্কার রাখার জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে, বর্জ্য সংগ্রহের গাড়ি আছে, নির্ধারিত স্থান আছে, প্রকল্প আছে, বরাদ্দও আছে। তারপরও শহরের ফুটপাত, সড়কের মোড়, নালা, খাল কিংবা আবাসিক এলাকার পাশে ময়লার স্তূপ দেখা যায়। কোথাও দিনের পর দিন বর্জ্য পড়ে থাকে, কোথাও রাতের আঁধারে আবর্জনা ফেলা হয়, আবার কোথাও নালা পরিণত হয় বর্জ্য ফেলার স্থানে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘শহর নোংরা কেন’ এমন নয়। প্রশ্ন হলো, এত আয়োজনের পরও ব্যবস্থাপনার ফাঁকটি কোথায় এবং ব্যর্থতার দায় নেবে কে?

বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সংখ্যা, আবাসিক এলাকা, বাজার ও ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে বর্জ্যও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘হোয়াট আ ওয়েস্ট ৩.০’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন টন পৌর বর্জ্য তৈরি হয়েছে। প্রচলিত ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে তা ৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় বর্জ্য সংগ্রহের ঘাটতিও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চিত্রটি উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক পৌর বর্জ্য উৎপাদনের হার ছিল প্রায় ০.৫২ কেজি। অর্থাৎ নগরায়ণ ও ভোগের ধরন বদলের সঙ্গে বর্জ্য এখন নগর ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় চ্যালেঞ্জ।

উৎস থেকেই শুরু হোক ব্যবস্থাপনা
বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে, এটি একা সমস্যার ব্যাখ্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আমরা এখনো অনেকাংশে শুধু ‘ময়লা সংগ্রহ ও সরিয়ে নেওয়া’ হিসেবে দেখি। অথচ একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনার শুরু হওয়ার কথা বর্জ্য তৈরির স্থান থেকেই। কী বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, কোনটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য, কোনটি জৈব আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ, এসব আলাদা করার পরই সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কথা। বাংলাদেশের ‘পৌর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১’ এ উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায়িত্বের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ নীতিগত কাঠামোর অভাবই সব সমস্যার মূল নয়, বড় ঘাটতি রয়েছে বাস্তব প্রয়োগে।

বাড়ির রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ, ধাতু ও অন্যান্য বর্জ্য একই ব্যাগে ভরে দেওয়া হলে পরবর্তী পুরো প্রক্রিয়াই জটিল হয়ে যায়। জৈব বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ও দূষণ তৈরি হয়, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ বর্জ্যই নিষ্পত্তির বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ উৎসে পৃথকীকরণ কার্যকর করা গেলে বর্জ্যের একটি বড় অংশ পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব।

দায়িত্বের অস্পষ্টতা ও নাগরিকের দায়
এখানে নাগরিকের দায় অবশ্যই আছে। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা, নালায় প্লাস্টিক ফেলা কিংবা নির্ধারিত সময় ও স্থান না মেনে বর্জ্য ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নাগরিকের আচরণকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করার অজুহাত বানানোও ঠিক নয়। মানুষকে নিয়ম মানতে বলা হলে নিয়ম মেনে চলার মতো বাস্তব ব্যবস্থাও দিতে হবে। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই, নির্দিষ্ট সময়ে বর্জ্য সংগ্রহ হয় না, কিংবা সংগ্রহের পর সব বর্জ্য আবার এক জায়গায় ফেলা হয়; এ অবস্থায় শুধু নাগরিক সচেতনতার কথা বললে সমস্যার সমাধান হবে না।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় দায়িত্বের অস্পষ্টতায়। বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, বাজারভিত্তিক বর্জ্য, চিকিৎসাবর্জ্য ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থা ও পক্ষ জড়িত। কিন্তু কোনো এলাকায় বর্জ্য পড়ে থাকলে নাগরিকের কাছে অনেক সময় স্পষ্ট থাকে না কোন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করবেন। ফলে দায়িত্ব ভাগ হয়, কিন্তু জবাবদিহি ভাগ হয় না। একটি প্রতিষ্ঠান অন্যটির দিকে তাকিয়ে থাকে, আর রাস্তার পাশে পড়ে থাকে বর্জ্য।

এই দায়হীনতার মূল্য দেয় পুরো শহর। জমে থাকা বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ও জীবাণু ছড়ায়, নালা বন্ধ হয়, জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে এবং পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়। প্লাস্টিক বর্জ্য এ সমস্যাকে আরও তীব্র করে। নালা, খাল ও জলাশয়ে জমে এটি পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই জলাবদ্ধতা নিয়ে শুধু খাল খনন বা নালা পরিষ্কারের আলোচনা যথেষ্ট নয়, বর্জ্য কোথা থেকে এসে সেই নালায় জমছে, সেটিও দেখতে হবে। একইভাবে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসাবর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সম্পদ হিসেবে বর্জ্যের ব্যবহার
আশার কথা হলো, সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সমন্বিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্জ্য কমানো, সম্পদ পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহার এবং সরকারি সক্ষমতা বাড়ানো। ২০২৩ থেকে ২০২৮ সাল মেয়াদি এই প্রকল্প মাঠপর্যায়ে কতটা ফল দিচ্ছে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এখানেই দরকার দৃশ্যমান জবাবদিহি। প্রতিটি ওয়ার্ডে দৈনিক কত বর্জ্য তৈরি হয়, কতটুকু সংগ্রহ হয় এবং কতটুকু পুনর্ব্যবহার হয়, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা উচিত। বর্জ্য সংগ্রহের সময়সূচি নাগরিকদের জানাতে হবে। কোনো এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য জমলে শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দায়ী না করে পুরো ব্যবস্থাপনা চেইনে কোথায় ব্যর্থতা হয়েছে, তা শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্যকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে কাঁচামাল এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শহর পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব কেবল ঝাড়ু হাতে থাকা মানুষের নয়। নাগরিককে দায়িত্বশীল হতে হবে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ম মানতে হবে এবং প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে কার্যকর সেবা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে জায়গায় ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে দায় নির্ধারণ করতে হবে। কারণ ময়লার স্তূপ কেবল একটি নোংরা জায়গার চিহ্ন নয়, এটি একটি ব্যর্থ ব্যবস্থাপনার দৃশ্যমান প্রমাণ। রাস্তা থেকে ময়লা সরিয়ে ফেলা সাময়িক সমাধান হতে পারে, কিন্তু একই জায়গায় বারবার ময়লা জমলে বুঝতে হবে সমস্যাটি বর্জ্যে নয়, ব্যবস্থাপনায়। একটি শহর কতবার ঝাড়ু দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে তার পরিচ্ছন্নতা মাপা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, বর্জ্য কোথা থেকে তৈরি হলো, কোথায় গেল এবং পুরো প্রক্রিয়ায় দায়িত্বটি কে পালন করল।

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!