শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

ডিগ্রি বাড়ছে, দক্ষতা বাড়ছে তো?

মুহিবুল হাসান রাফি

প্রকাশিত: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৬:২৪ PM ২০ বার পঠিত
ডিগ্রি বাড়ছে, দক্ষতা বাড়ছে তো?

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি সম্পাদিত

দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। সনদের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু এর সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও ক্রমেই সামনে আসছে: ডিগ্রি বাড়ার সঙ্গে দক্ষতা কতটা বাড়ছে?একজন তরুণ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে গিয়ে যখন বুঝতে পারেন, তাঁর একাডেমিক জ্ঞান আর কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে বড় ফাঁক, তখন সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থারও। চাকরিদাতারা অনেক সময় ভালো ফলের পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় কার্যকর লেখালেখি, কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা, দলগত কাজ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা খোঁজেন। কিন্তু এসব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো পর্যাপ্ত নয়।এর বড় কারণ, শিক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি শিক্ষার্থীকে প্রশ্নের উত্তর লিখতে শেখায়; কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে শেখায় না। শ্রেণিকক্ষে একটি বিষয় সম্পর্কে সংজ্ঞা জানা আর সেই জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা এক বিষয় নয়। অথচ কর্মক্ষেত্রে দ্বিতীয়টির প্রয়োজনই বেশি।
উচ্চশিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞানকে কাজে রূপান্তর করার সক্ষমতা তৈরি করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর কয়েক বছরের বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ হয় মূলত পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ও ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে। গবেষণা, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ সীমিত থাকে। ফলে সনদ হাতে এলেও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এই ব্যবধান সবচেয়ে স্পষ্ট হয় নিয়োগপ্রক্রিয়ায়। একই শিক্ষাগত যোগ্যতার অসংখ্য প্রার্থী চাকরির জন্য আবেদন করছেন। সেখানে শুধু ডিগ্রি আর আলাদা করে কোনো প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করছে না। একজন প্রার্থী কী জানেন, তার পাশাপাশি তিনি কী করতে পারেন নিয়োগদাতার কাছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ আর কর্মদক্ষতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি বহু কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। আজ যে দক্ষতা মূল্যবান, কয়েক বছর পর তার কিছু অংশের চাহিদা কমেও যেতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু নির্দিষ্ট কিছু তথ্য শেখানো যথেষ্ট নয়; তাদের এমন সক্ষমতা তৈরি করতে হবে, যাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত শেখা ও মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
এখানে সফট স্কিল এর গুরুত্বও উপেক্ষা করা যায় না। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় চমৎকার ফল করেছেন, কিন্তু নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেন না, একটি দল পরিচালনা করতে পারেন না, সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার অভ্যাস নেই কিংবা সমালোচনা গ্রহণ করে নিজেকে সংশোধনের মানসিকতা তৈরি হয়নি। কর্মক্ষেত্রে এসব দুর্বলতা দ্রুত প্রকাশ পায়। তাই যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, সময় ব্যবস্থাপনা, দলগত কাজ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে শিক্ষার আনুষ্ঠানিক অংশ করতে হবে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী করেও সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষার্থীকেও বুঝতে হবে ডিগ্রি কোনো শেষ গন্তব্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও শেখার বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। বই পড়া, লেখালেখি, বিতর্ক, উপস্থাপনা, স্বেচ্ছাসেবা, গবেষণা, প্রযুক্তি শেখা, প্রকল্পে কাজ করা কিংবা বাস্তব কোনো উদ্যোগ পরিচালনার অভিজ্ঞতা একজন শিক্ষার্থীর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে পারে। চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করলে অনেক দেরি হয়ে যায়; প্রস্তুতি শুরু করতে হয় শিক্ষাজীবন থেকেই।তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আরও বড়। পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী করা, ব্যবহারিক শিক্ষা বাড়ানো, আধুনিক ল্যাব ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি। ইন্টার্নশিপকে আনুষ্ঠানিকতা থেকে বের করে বাস্তব কাজ শেখার সুযোগে পরিণত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন বাড়াতে হবে, যাতে তারা শুধু মুখস্থ করে নয়, চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োগ করে শিখতে পারেন।
শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য সরবরাহ করবেন এমন ধারণা বদলাতে হবে। শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার সুযোগ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গবেষণার আগ্রহ এবং বাস্তব সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ দক্ষতা শুধু বই পড়ে অর্জিত হয় না; অনুশীলন, ভুল, সংশোধন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তা গড়ে ওঠে।একটি দেশের উচ্চশিক্ষার সাফল্য তাই শুধু কতজন ডিগ্রি পেলেন, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। দেখতে হবে, সেই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কতটা উৎপাদনশীল, কতটা উদ্ভাবনী এবং কতটা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। তারা কি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে? গবেষণা ও উদ্ভাবনে অবদান রাখছে? প্রযুক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করছে? দেশের অর্থনীতিতে নতুন মূল্য যোগ করছে?
ডিগ্রি একজন মানুষের শিক্ষাগত পরিচয় দেয়; দক্ষতা তার সক্ষমতার পরিচয় দেয়। সনদ চাকরির আবেদন করার সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার শক্তি আসে দক্ষতা থেকে। তাই এখন শুধু শিক্ষিত তরুণ তৈরির লক্ষ্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ, অভিযোজনক্ষম ও সমস্যা সমাধানে সক্ষম তরুণ প্রজন্ম।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পরবর্তী সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত তাই সনদের সংখ্যা নয়, সক্ষমতার গভীরতা। ডিগ্রি বাড়ছে এটি আশার খবর। কিন্তু সেই ডিগ্রির সঙ্গে যদি দক্ষতা না বাড়ে, তবে শিক্ষার বিস্তার কাগজেই আটকে থাকবে।

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!