শিরোনাম:
Network News BD
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

জিপিএ ফাইভের ইঁদুরদৌড় ও বিপন্ন শৈশব

রকমারি ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪০ PM ২১ বার পঠিত
জিপিএ ফাইভের ইঁদুরদৌড় ও বিপন্ন শৈশব

প্রতীকী ছবি © সম্পাদিত

প্রীতিদীপা দাশ:

কোচিং সেন্টারের দেয়ালে টাঙানো ঝলমলে ব্যানারটিতে সারিবদ্ধ সফল মুখগুলোর ভিড়। জিপিএ পাঁচ পাওয়ার সুনিশ্চিত পথ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পাওয়ার বিজ্ঞাপনে ভরা সেই দেয়ালের নিচে জীর্ণ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকে ষোলো বছরের এক কিশোর। তার হাতের মুঠোয় মুচড়ে থাকে বারো শত টাকার একটি ভর্তি ফরমের রসিদ, অন্য হাতে কোচিংয়ের প্রচারপত্র। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা পকেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে আঙুল দিয়ে গুনে দেখেন শেষ কয়েকটি নোট। চলতি মাসের সংসারের চাল-ডালের বরাদ্দ থেকে কতটা কাটছাঁট করলে বড় সন্তানের বকেয়া কিস্তি আর ছোট মেয়ের স্কুলের বেতন একসঙ্গে মেটানো সম্ভব হবে, সেই ভাবনায় বাবার চোখের কোণ ঝাপসা হয়ে আসে। কিশোরটি ব্যানারের দিকে তাকায় সত্য, কিন্তু তার চোখে নতুন কিছু জানার কৌতূহল থাকে না। সেখানে জমে থাকে কেবল প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ার এক হিমশীতল আতঙ্ক।

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করার আগেই একটি শিশু এই অলিখিত পাঠ্যক্রমটি শিখে ফেলে। এটি কোনো জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড অনুমোদন করেনি, কোনো সরকারি গেজেটেও এর উল্লেখ নেই। অথচ দেশের প্রতিটি শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর আগেই এই ব্যাকরণটি রক্তে মিশিয়ে নেয়। সেই অলিখিত সিলেবাসের মূল পাঠ হলো ভয়। ভুল করার শঙ্কা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তোলার দ্বিধা, পরীক্ষায় নম্বর কম পেয়ে পরিবারকে লজ্জিত করার ভয়, আর পকেটের জোর না থাকলে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করার শঙ্কা। রাষ্ট্র ও সমাজ তাকে শেখায় যে বিদ্যালয় কোনো মুক্ত চিন্তার অঙ্গন নয়, বরং এটি একটি নিছক ছাঁটাইখানা।

শিক্ষাকে যখন মৌলিক অধিকারের রাষ্ট্রীয় দায় থেকে বিচ্যুত করে উন্মুক্ত বাজারের পণ্যে পরিণত করা হয়, তখন ভীতির চেয়ে বড় মূলধন আর কিছু হতে পারে না। আজ নগর থেকে গ্রামে গড়ে ওঠা হাজার হাজার কোচিং সেন্টার, গাইড বইয়ের শতকোটি টাকার বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য কিংবা প্রাইভেট টিউটরের পশরা দাঁড়িয়ে আছে একটিমাত্র চালিকাশক্তির ওপর। তা হলো পিছিয়ে পড়ার আতঙ্ক।

রাষ্ট্র আইনিভাবে বিনামূল্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ঘোষণা দেয় ঠিকই, কিন্তু শ্রেণিকক্ষের পঠনপাঠনকে এমনভাবে নিষ্প্রাণ ও দুর্বল করে রাখা হয়, যাতে শিক্ষার্থী বাধ্য হয় সেই একই শিক্ষকের ব্যাচে কিংবা পাশের কোচিংয়ে গিয়ে টাকা ঢালতে। যে শিক্ষা স্কুলে বিনামূল্যে পাওয়ার কথা ছিল, তা কেবল শ্রেণিকক্ষের বাইরে এসে চড়া দামে পূর্ণতা পায়। ফলে বিনামূল্যে শিক্ষার রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপনের আড়ালে প্রতিটি পরিবারের ওপর চেপে বসে এক অদৃশ্য ও নির্মম ঋণের বোঝা। শিক্ষা এখানে কোনো মানবিক বিকাশের যাত্রা নয়, বরং মাস শেষে রসিদে লেখা এক আর্থিক বাধ্যবাধকতা।

একই ভৌগোলিক সীমানায়, একই জাতীয় পতাকার নিচে বসবাস করেও আমাদের শিশুরা মূলত তিনটি আলাদা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূখণ্ডে বাস করে। এই বিভাজন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত কাঠামোগত বৈষম্য:

  • ইংরেজি মাধ্যম: উচ্চ ব্যয়নির্ভর এই ধারায় বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা শৈশব থেকেই বৈশ্বিক নাগরিকত্বের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু আকাশচুম্বী খরচের কারণে তা কেবল সমাজের একটি নির্দিষ্ট উচ্চবিত্ত অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা তাদের দেশীয় বাস্তবতা থেকে বহু দূরে সরিয়ে রাখে।

  • সাধারণ বাংলা মাধ্যম: মূলধারার কোটি কোটি শিক্ষার্থী এই ধারায় পড়ে। ঘন ঘন পরিবর্তিত কারিকুলাম, অতিরিক্ত পরীক্ষাভীতি, মুখস্থনির্ভরতা এবং জিপিএ পাঁচ পাওয়ার অন্ধ ইঁদুরদৌড়ে তারা প্রতিনিয়ত পিষ্ট হতে থাকে।

  • মাদ্রাসা ও প্রান্তিক চরাঞ্চল: হাওর, চর, পাহাড় কিংবা দূরবর্তী গ্রামের জীর্ণ প্রাথমিক স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোতে পড়ে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও আধুনিক অবকাঠামোর তীব্র অভাবে এই শিক্ষার্থীরা শৈশব থেকেই মূল অর্থনীতির সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ে।

সংবিধানে ‘শিক্ষার সুযোগের সমতা’র কথা লেখা থাকলেও বাস্তবতার এই গভীর খাদ প্রমাণ করে যে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সমাজকে একীভূত করার বদলে শ্রেণিবিন্যাসকে আরও পোক্ত করে তুলছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষাকে অসম ও দামি করে তোলার চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াই এ দেশে নতুন নয়। ১৯৬২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর তৎকালীন আইয়ুব খান সরকারের অনুসৃত বৈষম্যমূলক ‘শরীফ কমিশন’-এর বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল ছাত্রসমাজ। সেই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাকে কেবল বিত্তশালীদের একচ্ছত্র অধিকারে পরিণত করার চক্রান্ত রুখে দেওয়া। বাবুল, মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহর মতো ছাত্ররা সেদিন রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে শিক্ষা কোনো অভিজাতের অনুদান নয়, তা নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

আজ ১৯৬২ সালের ৬৪ বছর পর এসে দেখা যায়, সংকট আবার ফিরে এসেছে, তবে তার রূপ বদলে গেছে। তৎকালীন সরকার ডিক্রি জারি করে শিক্ষাকে দামি করতে চেয়েছিল; আর ২০২৬ সালে এসে সেই একই কাজ করা হচ্ছে বাজারের হাতে শিক্ষাকে সমর্পণ করে। আজ সরাসরি কেউ শিক্ষা বন্ধ করে না, বরং একে এমনভাবে ব্যয়বহুল করা হয় যাতে সাধারণ পরিবার নিজ থেকেই পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। ১৯৬২ সালে প্রতিবাদ ছিল যৌথ, সেখানে মিছিল ও সরাসরি আন্দোলন ছিল। কিন্তু আজকের সংকট আরও বিপজ্জনক, কারণ লড়াইটা নিতান্তই বিচ্ছিন্ন। আজ প্রতিটি পরিবার তার নিজ ঘরের ভেতরে একা একা লড়ছে। খরচের হিসাব মেলাতে না পেরে যে বাবা নিভৃতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, তার সেই কষ্ট কোনো যৌথ রাজনৈতিক দাবি হয়ে রাজপথে নামতে পারে না।

তত্ত্ব ও বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে যদি নিজের শৈশবের দিকে তাকাই, তবে সেই ভয়ের চেহারাটি খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমবার পরীক্ষার খাতা ফেরত পাওয়ার মুহূর্তটি এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। মূল বইয়ের নির্ধারিত উত্তরের বাইরে নিজের মতো করে দুটো বাক্য যোগ করার অপরাধে সম্পূর্ণ উত্তরের ওপর টেনে দেওয়া হয়েছিল লাল কালির বিশাল ক্রস চিহ্ন। শিক্ষক সেদিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, এখানে নিজের মতো করে ভাবার কোনো স্থান নেই; মুখস্থ উত্তর উগরে দেওয়াটাই প্রধান কাজ।

একবার পাঠ্যবইয়ের একটি তথ্যের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করায় সমগ্র ক্লাসের সামনে শিক্ষকের ব্যঙ্গাত্মক জবাব শুনে চুপসে যেতে হয়েছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, শ্রেণিকক্ষে কৌতূহল প্রকাশ করা মানেই নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। কিন্তু এর চেয়েও গভীর ক্ষত তৈরি হতো মাসের শেষে স্কুলে বেতনের নোটিশ হাতে নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তে। নোটিশটি পাওয়া মাত্র মায়ের মুখের হাসিখুশি ভাবটা এক মুহূর্তে মিলিয়ে যেত। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে সংসারের জরুরি খরচের টাকা বের করতেন। একটি শিশুর জন্য এর চেয়ে বড় মানসিক চাপ আর হতে পারে না, যখন সে বুঝতে পারে যে তার শিক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে মা-বাবাকে প্রতিদিন কোনো না কোনো মৌলিক প্রয়োজন থেকে নিজেদের বঞ্চিত করতে হচ্ছে।

আমরা যদি ভীতির এই অন্ধকার থেকে বের হতে চাই, তবে আমাদের একটি নতুন শিক্ষাঙ্গনের চিত্র কল্পনা করতে হবে। আমরা আসলে কেমন শিক্ষা চাই?

আমরা চাই এমন এক ক্লাসরুম, যেখানে প্রশ্ন করাটা কোনো অপরাধ হিসেবে দেখা হবে না, বরং শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর এক মুক্ত কৌতূহলপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে। আমরা চাই এমন এক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যা তিন ঘণ্টার একটি মেকানিক্যাল পরীক্ষার ভিত্তিতে মানুষের পুরো জীবন বা যোগ্যতা মেপে দেবে না। ভুল করাকে যেখানে অপরাধ হিসেবে না দেখে, শেখার প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য ধাপ হিসেবে গণ্য করা হবে। আমরা চাই হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীর্ণ পাঠশালার শিশুটি আর শহরের বিত্তবান পরিবারের সন্তান একই মানের শিক্ষকের সান্নিধ্য ও সমান সুযোগ পাবে। শিক্ষা যেখানে প্রতিযোগিতার ময়দান না হয়ে পারস্পরিক সহানুভূতি ও মানবিক বিকাশের উন্মুক্ত ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।

“মুক্ত করো ভয়” শব্দবন্ধটি কেবল মিছিলের ব্যানার বা স্মারকের স্লোগান হিসেবে থাকলে তা কোনো পরিবর্তন আনে না। যে ভয় প্রতিদিনের পারিবারিক বাজেটের ভেতর, অভিভাবকের আতঙ্কের রাতে আর শিক্ষার্থীর মনের গহিন কোণে বাসা বেঁধেছে, তাকে চিনতে পারাটাই প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। ১৯৬২ সালের আন্দোলনের গৌরব স্মরণ করা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা বর্তমানের এই নীরবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতিকে অস্বীকার করতে পারব। দেয়ালে লেখা স্লোগানে কণ্ঠ মেলানো সহজ, কিন্তু প্রতিদিনের রুটিনে মিশে থাকা ভয়ের অলিখিত পাঠ্যক্রমকে চেনা এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই আজ সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক লড়াই।

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!