নুন ও ছোট্ট পাখি
মাইমুনা খাঁন
মালিবাগ থেকে কিছুটা দূর এগোলেই চোখে পড়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘প্যারাডাইস হোম’। দশতলা ভবনটির পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ। ব্যস্ত শহরের বুকে গাছটি যেন এক টুকরো সবুজ আশ্রয়। ঋতু বদলায়, গাছের রং বদলায়, পাখিরা আসে, আবার উড়ে যায়।
এই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে থাকে ছোট্ট রাফিদা নুন। তার মা হেবেন সংসার আর ছোট ছেলে ফাইয়াজকে নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। নুনেরও অনেক কথা আছে—স্কুলের গল্প, মেঘের গল্প, ঈদের গল্প। কিন্তু তার কথাগুলো শোনার মতো সময় যেন কারও নেই।
কয়েক দিন ধরে স্কুলে যাওয়ার আগে নুন কৃষ্ণচূড়া গাছটির দিকে তাকায়। গাছের কাণ্ডের একটি কোটরে থাকে পাখির ছোট্ট পরিবার। ভোরবেলা মা-বাবা খাবারের খোঁজে উড়ে যায়, আর ছানাটি কোটরের ভেতর বসে থাকে।
ছয় দিন পর এক সকালে নুন দেখল, ছানাটি কোটর থেকে উঁকি দিচ্ছে।
— এই যে, ছোট্ট পাখি!
ছানাটি আবার ভেতরে লুকিয়ে পড়ল।
— ভয় পেয়ো না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না!
কিছুক্ষণ পর পাখিটি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে একটি ডালে বসল। নুন বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বলল,
— আমি নুন। তোমার নাম কী?
পাখিটি মাথা কাত করে তাকিয়ে রইল।
— আমার কথা বুঝতে পারো না? আচ্ছা, সমস্যা নেই। তুমি শুধু শোনো।
নুন একটু থামল। তারপর গোপন কথা বলার ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল,
— জানো, এবার ঈদে কী হয়েছে? আমাদের গরুটাকে যখন কোরবানি দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, ঠিক তখনই সে উঠে দৌড়! সঙ্গে সঙ্গে আমিও দৌড়। হা হা হা!
পাখিটি ডাল বদলে বসল।
নুন হেসে বলল,
— আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করি? ‘ভ্যাবলা’ মানে কী? তুবা আমাকে ভ্যাবলা বলেছে। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, এটা নাকি খারাপ কথা। তোমার মাকে জিজ্ঞেস করে আমাকে বলবে?
পশ্চিম আকাশে তখন কালো মেঘ জমেছে। নুন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ছোট্ট পাখি, তাড়াতাড়ি বাসায় যাও। বৃষ্টি হবে!
দূর থেকে ভেসে এল মায়ের ডাক।
— নুন! কোথায় তুমি?
— আসছি, মা!
হেবেন বারান্দায় এসে মেয়েকে একা একা কথা বলতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
— কার সঙ্গে কথা বলছ?
— আমার নীরব বন্ধুর সঙ্গে।
— কে তোমার বন্ধু?
নুন গাছের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
— ওই যে, ছোট্ট পাখি!
হেবেন একটু এগিয়ে আসতেই পাখিটি কোটরের ভেতর ঢুকে পড়ল।
নুনের মন খারাপ হলো। এতক্ষণ যে বন্ধুটি তার সব কথা শুনল, মাকে দেখেই সে পালিয়ে গেল কেন?
পাখিদের জন্য পৃথিবীটা আগের মতো নিরাপদ নেই। একের পর এক গাছ কাটা পড়ছে, ছোট হয়ে আসছে তাদের আবাসস্থল। খাবার আর আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পাখি শহরে চলে আসছে। এই পাখি পরিবারও তার ব্যতিক্রম নয়। মানুষের কাছাকাছি থাকলেই যে বিপদ, তা তারা বারবার দেখেছে। তাই ছানাটিকে মা-বাবা সব সময় সাবধান করে—মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে।
পরদিন সকালে পাখির মা-বাবা খাবারের খোঁজে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর নুন বারান্দায় এসে ডাকল,
— ছোট্ট পাখি! আমার গল্প শুনবে না?
ছানাটি উঁকি দিল, কিন্তু বের হলো না। মা-বাবার সাবধানবাণী তার মনে পড়ে গেছে।
নুন অপেক্ষা করল। তারপর আবার ডাকল,
— তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ? সবাই আমাকে এড়িয়ে যায়। তুমিও যাবে?
শেষ কথাটি বলতে গিয়ে নুনের গলা কেঁপে উঠল।
পাখিটি কোটরের মুখে এসে দাঁড়াল। তারও বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু সে যেন ভয় আর কৌতূহলের মাঝখানে আটকে রইল।
নুন চুপ করে গেল। যখন তার খুব মন খারাপ হয়, তখন সে একা একা একটি গান গায়। আজও গুনগুন করে উঠল—
মিটিমিটি ছোট্ট তারা,
বল তো তুমি কেমন ধারা?
আকাশজুড়ে জ্বলছ কেন,
কোথায় তোমার ঘর যে যেন?
গান শেষ হওয়ার পর নুন ঘরে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই পাখিটি কোটর থেকে বেরিয়ে এসে গাছের সেই ডালে বসল, যেটি বারান্দার সবচেয়ে কাছে।
নুনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
— তুমি এসেছ!
সেদিন থেকে তাদের বন্ধুত্ব শুরু হলো।
স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ রেখেই নুন বারান্দায় ছুটে যেত। পাখিটিকে ডাকত, স্কুলের গল্প বলত, কাজিনদের কথা বলত। পাখিটি কখনো ডানা ঝাপটাত, কখনো মাথা কাত করে তাকিয়ে থাকত। নুন জানত না, পাখিটি তার কথা কতটুকু বোঝে। তবু তার মনে হতো, কেউ একজন অন্তত তার কথা শুনছে।
একদিন নুন নিজের জন্য আনা বিস্কুট হাতে নিয়ে বারান্দায় বসেছিল। পাখিটি ডালে এসে বসল। নুন বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমাকে এটা দিতে পারব না। মা বলেছেন, মানুষের খাবার পাখিদের জন্য ভালো নয়।
পাখিটি ডানা ঝাপটাল। নুন হেসে উঠল।
দিনগুলো এভাবেই কাটছিল। নুনের নিঃসঙ্গতা কিছুটা কমে এল। প্রতিদিন তার অপেক্ষা করার মতো একজন ছিল।
তারপর এল ডিসেম্বরের একত্রিশ তারিখ।
রাত বারোটার পর নতুন বছর শুরু হবে। চারদিকে আয়োজন চলছে। নুন সেদিনও বারান্দায় এসে পাখিটিকে বলল,
— ছোট্ট পাখি, আজ নতুন বছর! সবাই সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাবে। তুমি কিন্তু আসবে!
পাখিটি হয়তো কথার অর্থ বুঝল না, কিন্তু নুনের কণ্ঠ চিনতে পারল।
সন্ধ্যা নামতেই পাখির মা-বাবার অস্থিরতা বাড়ল। তারা জানে, নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে মানুষ আতশবাজি ফোটাবে। সেই তীব্র শব্দ আর ঝলমলে আলোয় পাখিরা ভয় পায়, দিক হারায়, কখনো আহতও হয়। ছানাটিকে তারা কোটরের গভীরে রাখল।
রাত এগারোটা পঞ্চাশে নুন আবার বারান্দায় এল। হাতে নিজের জন্য কিছু বিস্কুট। সে ডাকল,
— ছোট্ট পাখি!
ছানাটি কোটর থেকে উঁকি দিল।
ঠিক তখনই চারদিক কাঁপিয়ে শুরু হলো আতশবাজি। একটার পর একটা বিকট শব্দ। আকাশে রঙিন আলো, বাতাসে ধোঁয়া, মানুষের উল্লাস।
কিন্তু কৃষ্ণচূড়া গাছের কোটরে নেমে এল আতঙ্ক।
ছানাটি ডানা ঝাপটাতে লাগল। তার মা-বাবা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু শব্দ থামল না। নুন দেখল, পাখিটি অস্থির হয়ে ডানা মেলে উড়তে গিয়ে নিচের দিকে পড়ে গেল।
— মা! তাড়াতাড়ি এসো! ছোট্ট পাখিটার কী হয়েছে!
হেবেন ছুটে এলেন। পাখিটিকে দেখে তিনি মেয়েকে শান্ত করলেন এবং সাবধানে সাহায্যের ব্যবস্থা করলেন। বাইরের শব্দ থেকে দূরে একটি শান্ত জায়গায় রেখে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হলো।
সারা রাত নুনের ঘুম হলো না। বারবার সে জিজ্ঞেস করল,
— ও ঠিক হয়ে যাবে তো?
হেবেন মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন।
— আমরা ওকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি, মা।
কয়েক দিন পর পাখিটি সুস্থ হয়ে উঠল। প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিয়ে তাকে আবার গাছের কাছাকাছি নিরাপদ পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। নুন দূর থেকে দেখল, পাখিটি কোটরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মা-বাবাও কাছে উড়ে এল।
নুনের মুখে হাসি ফুটল।
— কাল আবার দেখা হবে, ছোট্ট পাখি!
কিন্তু পরদিন স্কুল থেকে ফিরে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাকল,
— ছোট্ট পাখি!
কেউ এল না।
প্রথম দিন নুন ভাবল, পাখিটি হয়তো ঘুমাচ্ছে। পরদিন ভাবল, মা-বাবার সঙ্গে খাবার খুঁজতে গেছে। কিন্তু দিন পেরিয়ে গেল, পাখিটি আর দেখা দিল না।
একদিন নুন গাছের কোটরের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেটি একেবারে নিঃশব্দ। তার মনে হলো, পাখিটি হয়তো বড় হয়ে উড়তে শিখেছে, নিজের পৃথিবী খুঁজে নিয়েছে। কিন্তু সেই ভাবনাও তার মনকে শান্ত করতে পারল না।
এখনো প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে নুন বারান্দায় দাঁড়ায়। কখনো হাতে নিজের জন্য আনা বিস্কুট থাকে, কখনো থাকে নতুন কোনো গল্প। সে গাছের দিকে তাকিয়ে ডাকে,
— ছোট্ট পাখি! তুমি কোথায়?
কৃষ্ণচূড়ার পাতাগুলো বাতাসে দোলে। দূরে কোনো পাখি ডেকে ওঠে। নুন এক মুহূর্তের জন্য চমকে তাকায়, তারপর আবার অপেক্ষা করে।
হয়তো একদিন পাখিটি ফিরবে। হয়তো আর কোনো দিনই ফিরবে না।
নুন তা জানে না।
