মোক্তারপাড়ার বকুলতলায় তখন বিকেলের নরম আলো। পুকুরের শান্ত জল গাছের ছায়া আর মৃদু বাতাসে চারপাশে একধরনের স্থিরতা। সেই স্নিগ্ধ পরিবেশেই গোল হয়ে বসেছিলেন কয়েকজন পাঠক। কারও হাতে বই তো কারও হাতে নোটবুক। আলোচনার কেন্দ্রে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস আরণ্যক।
অ আ ক খ নেত্রকোনা জেলা টিমের আয়োজনে এই পাঠচক্রে ছিলেন ছয় সাতজন পাঠক। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন একজন শিক্ষক ও লেখক এবং স্থানীয় এক কবি। বিকেল তিনটায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে আড্ডা শুরু হয় প্রায় সাড়ে চারটায়। বড় কোনো আয়োজন নয় ছিল না মঞ্চ কিংবা আনুষ্ঠানিকতার বাড়াবাড়ি। সেখানে ছিল শুধু বই এবং তা নিয়ে কথা বলার দারুণ আন্তরিকতা।
আলোচনা শুরু হয় বিভূতিভূষণের সাহিত্যদৃষ্টি ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক নিয়ে। সেখান থেকে কথার কেন্দ্রে আসে আরণ্যক। অরণ্য এখানে শুধু গাছপালা কিংবা বিস্তীর্ণ প্রান্তর নয় মানুষের নিঃসঙ্গতা জীবনসংগ্রাম এবং সভ্যতার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কও উপন্যাসটির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
পাঠচক্রে তাই গল্প চরিত্রের পাশাপাশি উঠে আসে প্রকৃতি মানুষ ও সভ্যতার পারস্পরিক সম্পর্কের নানাদিক। বকুলতলার সবুজ পরিবেশও যেন সেই আলোচনাকে আরও অর্থবহ করে তোলে। বইয়ের পাতার অরণ্য আর চারপাশের প্রকৃতির মধ্যে তৈরি হয় এক নীরব সংযোগ। একপর্যায়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে সমকালীন সাহিত্য পাঠাভ্যাস ও নানা সাহিত্যিক প্রসঙ্গে। একটি উপন্যাসকে ঘিরে শুরু হওয়া পাঠচক্র ধীরে ধীরে পরিণত হয় সাহিত্য নিয়ে এক প্রাণবন্ত আড্ডায়।
বিকেল শেষে বই বন্ধ হয়েছে থেমেছে কথাও। কিন্তু পাঠের রেশ যেন রয়ে গেছে সবার মাঝে। কারণ একটি ভালো বই শুধু পড়া শেষ হওয়ার সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় না বরং তার ভাবনা পাঠকের মনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। বকুলতলার সেই বিকেলও তাই কেবল একটি পাঠচক্র ছিল না এটি ছিল প্রকৃতির ছায়ায় বইকে নতুন করে আবিষ্কারের এক ছোট অথচ গভীর আয়োজন। বই বন্ধ হলেও আরণ্যক উপন্যাসের অরণ্য ঠিকই রয়ে গিয়েছিল পাঠকদের কথায় ও ভাবনায়।
